কাঁঠালের স্বাদে নতুন চমক ও বৈচিত্র্যময় আয়োজন।

বাঙালির সেরা ফলের মধ্যে পড়ে কাঁঠাল। কাঁঠাল আমরা বাঙালিদের জাতীয় ফল হিসেবে পরিচিত। এটি একটি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাবার, যা গ্রীষ্মকালে পাওয়া যায়। তবে আজকাল সারাবছরই কাঁঠাল পাওয়া যায়। কাঁঠাল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফল। এক একটি কাঁঠাল গাছে অনেক গুলো ফল হয়। কাঁঠাল ফল, গাছেল ডালে বা গুড়ির সঙ্গে ঝুলে থাকে। ফলটি বাইরের ‍দিকে কাঁটাযুক্ত এবং ভেতরে হলুদ রঙের মিষ্টি অনেকগুলো কোয়া থাকে। প্রতিটি কোয়ার মধ্যে একটি করে বীজ থাকে। কাঁঠাল গাছ বড় ও ছায়াযুক্ত হয়। কাঁঠালে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, শর্করা ও খনিজ পদার্থ থাকে। এটি দেহের শক্তি বৃদ্ধি করে এবং পুষ্টির ঘাটতি পূরণে সাহায্য করে। কাঁঠাল কাঁচা ও পাকা অবস্থায় খাওয়া যায়। কাঁচা কাঁঠাল সবজি হিসেবে আর পাকা কাঁঠাল ফল হিসেবে খাওয়া হয়। কাঁঠালের বীজও ভেজে, সিদ্ধ করে বা তরকারি রান্না করে খাওয়া যায়। আমাদের দেশের প্রায় সব এলাকাতেই কাঁঠালের চাষ হয়। আমাদের দেশে কাঁঠাল সহজলভ্য হওয়ায় এটি আমাদের সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। তাই কাঁঠালকে জাতীয় ফল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, কাঁঠাল আমাদের ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা কাঠাল শুধু পাকা অবস্থাতেই  খাই তা কিন্তু নয়, কাঁচা কাঠাল ‍দিয়ে রান্না করা যায়। কাঁচা কাঠাল ‍দিয়ে হরেক রকমের সুস্বাদু রেসিপি বানানো যায়। কাঁঠাল তার মিষ্টি স্বাদে আনে নতুন চমক। আর এই কাঁঠাল এবং কাঁঠালের বিভিন্ন রেসিপি খেতে আমরা সবাই ভালোবাসি।

কাঁঠাল একটি পুষ্টি সমৃদ্ধ ফল। সাধারণ কাঁঠাল শুধু নির্দিষ্ট মৌসুমে পাওয়া যায়। তবে নতুন ও হাইব্রিড জাতগুলো সারাবছরই ফলন দিয়ে থাকে। কাঠালে রয়েছে থায়ামিন, রিবোফ্লাভিন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, সোডিয়াম, জিঙ্ক এবং নায়াসিনসহ বিভিন্ন প্রকার পুষ্টি উপাদান। তাছাড়া কাঁঠালে প্রচুর পরিমাণে আমিষ, শর্করা ও ভিটামিন থাকায় তা মানব দেহের জন্য বিশেষ উপকারী। কাঁঠালে আছে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা আমাদের দেহকে ক্ষতিকর ফ্রির‌্যাডিকেলস থেকে রক্ষা করে। তাছাড়া আমাদেরকে সর্দি ও কাশি রোগের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। টেনশন ও নার্ভাসনেস কমাতে কাঠাঁল বেশ উপকারী। কাঁঠালে আছে প্রচুর পরিমাণে খনিজ উপাদান ম্যাঙ্গানিজ যা রক্তে শর্করা বা চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কাঁঠালে আছে ভিটামিন বি৬ যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। কাঁঠাল শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। কাঁঠাল শরীরের টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে। কাঁচা ও পাকা কাঠালে আলাদা আলাদা পুষ্টিগুণ রয়েছে। কাঁঠাল কাচা অবস্থায় এটি আমরা তরকারি হিসেবে খেয়ে থাকি, এর মধ্যে প্রচুর মাইক্রোমিনারেল ভিটামিন ক্যারি করে। ভিটামিন এ থেকে শুরু করে সবগুলো ভিটামিনই আমরা কাঁচা কাঁঠালে পাই। আর কাঁঠাল যখন পেকে যায় এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, ফাইবার এবং অনেক বেশি এন্যার্জি থাকে। এটি তখন অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর হয়ে যায়। আর পাকা কাঁঠালের বীজ  আমাদের শরীরে প্রোটিন ক্যারি করে। কাঁঠাল শুধু কাচা বা পাকা অবস্থাতেই খাওয়া যায় এমন নয়, কাঁঠাল দিয়ে বিভিন্ন ধরনের রেসিপি বানানো যায়।

কাঁঠালের পরিচিতি

কাঠালের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো এটি বাংলাদেশের জাতীয় ফল এবং এটি বিশ্বের বৃহত্তম গাছ উৎপাদিত ফল। কাঁঠাল খুবই সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল। অন্য সব ফলের চেয়ে কাঁঠাল আকারে বড়। কাঁঠালের বৈজ্ঞানিক নাম Artocarpus heterophyllus এবং এটি মোরাসিয়া পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। কাঁচা কাঁঠাল সবজি এবং পাকা কাঁঠাল ফল হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এটি ভিটামিন ও খনিজে ভরপুর।কাঁঠালের উৎপত্তি মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে, বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালায়। একটি পরিপূর্ণ কাঁঠাল গাছ ১৫ থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। কাঁঠাল সাধারণত গ্রীষ্মকালে পাকে তবে কিছু হাইব্রিড জাতের কাঁঠাল সারা বছরই পাওয়া যায়। কাঁঠাল বিশ্বের বৃহত্তম গাছের ফল, যা ওজনে ৫৫ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। কাঁঠালের বাইরের আবরণটি সবুজ বা হলুদ রঙের হয় এবং কাঁটাদার হয়। কাঁঠালের ভেতরে অনেকগুলো কোষ বা কোয়া থাকে, যার ভেতরের অংশে বীজ বা বিচি থাকে। একটি কাঁঠাল কাটলে অনেক সময় ১০০ থেকে ৫০০ টির ও বেশি কোয়া বা কোষ পাওয়া যায়। প্রতিটি কোয়ার বা কোষের ভেতরে থাকে একটি করে বিচি। অর্থাৎ একটি মাত্র ফল থেকেই শত শত নতুন গাছ জন্মানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়। কাঁঠাল একটি ‍দ্বি-বীজপত্রী, কাষ্ঠল ও চিরহরিৎ বৃক্ষ। বাংলাদেশের সব জেলাতেই কাঁঠালের চাষ হয়। গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহের ভাওয়াল এলাকায় কাঁঠালের বাগান করা হয়। সিলেট, চট্টগ্রাম ও রংপুর এলাকায় কাঁঠাল চাষ করা হয়। কাঁঠাল লাল মাটির উঁচু জমিতে ভালো জন্মে।  

কাঁঠালের আধুনিক ও ভিন্নধর্মী রেসিপি

কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল। কাঁচা কাঠাল আমরা সবজি হিসেবে খাই এবং পাকা কাঁঠাল খাই ফল হিসেবে। কাঁচা কাঁঠাল এবং কাঁঠালের বিচি দিয়ে বানানো যায় মজাদার সব আধুনিক ও ভিন্নধর্মী রেসিপি। প্রচলিত তরকারির বাইরেও এগুলো দিয়ে আধুনিক ও ভিন্নধর্মী রেসিপি তৈরি করা যায়। ভিন্নধর্মী  রেসিপি কাঁঠালকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে। কাঁঠালের জনপ্রিয় কয়েকটি আধুনিক রেসিপি হল কাঁঠালের তরকারি, কাঁঠালের বিচির হালুয়া, কাঁঠাল বিচি ‍দিয়ে মুরগির মাংস, কাঁচা কাঁঠালের চপ, কাঁঠালের চিপস, কাঁঠালের পাকোড়া, কাঁঠালের কাবাব, কাঁঠালের বার্গার, কাঁঠালের টাকো, কাঁঠালের পাস্তা, কাঁঠালের পিৎজা, কাঁঠালের কাটলেট, কাঁঠালের নাগেটস, কাঁঠালের বিরিয়ানি, কাঁঠালের স্যান্ডউইচ, কাঁঠালের সালাদ। কাঁঠালের বিচির শাহী হালুয়ার উপকরণ, কাঁঠালের বিচি আধা কেজি, ঘি আধা কাপ, চিনি আধা কাপ, গুড়া দুধ আদা কাপ, কনডেন্সড দুধ আধা কাপ। প্রস্তুত প্রণালী, বিচি সিদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে ব্লেন্ডারে বা পাটায় মিহি করে বেটে নিন। কড়াইয়ে ঘি গরম করে বাটা বিচি ‍দিয়ে দিন। এরপর চিনি, কনডেন্সড মিল্ক ও গুড়া দুধ ‍দিয়ে নাড়তে থাকুন। হালুয়া প্যান ছেড়ে দিলে এবং আঠালো হয়ে এলে নামিয়ে বরফির আকারে কেটে নিন। কাঁচা কাঁঠালের চপের উপকরণ, সিদ্ধ কাঁচা কাঁঠাল ১ কাপ, আলু সিদ্ধ ১ কাপ, পেঁয়াজ কুচি ১ কাপ, ১টেবিল চামচ কাঁচা মরিচ কুচি, ১ টেবিল চামচ ধনে পাতা কুচি, ১ চামচ লবণ, ১ চামচ করে হলুদ গুড়া, মরিচ গুড়া, জিরে গুড়া, ধনে গুড়া, ১ চামচ চাট মসলা, ১ চামচ গরম মসলার গুড়া, ১ চামচ চিনি, ২ টেবিল চামচ বেসন, ২ চা চামচ কর্ন ফ্লাওয়ার ও তেল। প্রস্তুত প্রণালী, কাঁচা কাঁঠাল টুকরা করে সিদ্ধ করে নিন। আলু সিদ্ধ করে নিন। এখন একটি পাত্রে তেল ও কর্ন ফ্লাওয়ার বাদে উপরের সব উপকরণ মেখে নিন। হাতে তেল মেখে চপ বানিয়ে নিন। তারপর ২০ মিনিট ফ্রিজে রেখে দিন। এবার প্যানে তেল গরম হলে চপ গুলো কর্ন ফ্লাওয়ার ব্যাটারে চুবিয়ে ডুবো তেলে ভালো করে ভেজে তুলে নিন। কাঠালের চিপসের উপকরণ, ৬ পিস শক্ত পাকা কাঠাল, ১/২ চা চামচ শুকনো মরিচ, ১/২ চা চামচ গোল মরিচ গুঁড়া, তেল। প্রস্তুত প্রণালী: কাঁঠালের কোয়া চিকন করে কেটে নিন। মাইক্রোতে ৫ মিনিট ‍দিয়ে ড্রাই করে নিতে হবে। এবার ডুবো তেলে ভেজে তুলে নিন। তারপর মরিচ গুঁড়া, গোল মরিচ গুঁড়া ও বিট লবণ দিয়ে মাখিয়ে পরিবেশন করুন। কাঁঠালের পাকোড়ার উপকরণ, ১ কাপ কাঁঠাল দানা, ১টি আলু, ১টি ডিম, ২ পিস পাউরুটি, ১ টেবিল চামচ করে পেঁয়াজ কুচি, মরিচ কুচি, ধনেপাতা কুচি, ২টি শুকনা মরিচ, ১ চা চামচ লবণ, ১ চা চামচ গরম মসলা গুঁড়া, ১ টেবিল চামচ ময়দা, ভাজার জন্য তেল। প্রস্তুত প্রণালী, কাঁঠাল দানা গুলো টেলে খোসা ছাড়িয়ে বেটে বা ব্ল্যান্ড করে নিতে হবে। আলু সিদ্ধ করে নিন। পাউরুটি জলে ভিজিয়ে চিপে, তুলে রাখতে হবে। শুকনো মরিচ টেলে গুঁড়া করে নিতে হবে। একটি বাটিতে কাঁঠাল দানা বাটা, আলু সেদ্ধ, পাউরুটি ভেজানো, তেল ও ময়দা বাদে বাকি সব উপকরণ মেখে নিতে হবে। তারপর গোল গোল আকারে পাকোড়া করে, ময়দায় গড়িয়ে তেলে ভেজে, বাদামি আকার হলে তুলে নিন।

কাঁঠালের জুস

কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল। এটি খেতে খুবই সুস্বাদু হয়। আর এই কাঁঠালের জুস নাম শুনলেই যেন মনটা শান্ত হয়ে যায়। গরমের দিনে কাঁঠালের মিষ্টি ও সুগন্ধি স্বাদে তৈরি জুস হতে পারে দারুণ একটি পানীয়। পাকা কাঁঠালের কোয়া থেকে খুব সহজেই তৈরি করা যায় সুস্বাদু কাঁঠালের জুস। কাঁঠালের কোয়া থেকে বিচি ও আশ আলগা করে সামান্য পানি, বরফ ও পরিমাণ মত চিনি দিয়ে ব্লেন্ড করে তৈরি করা হয় মজাদার কাঁঠালের জুস। আপনি চাইলে এতে দুধ, বা লেবুর রস যোগ করে স্বাদে ভিন্নতা আনতে পারেন।

কাঁঠালের বিরিয়ানি

কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার তৈরি করা যায়। তেমনই এক লোভনীয় খাবার হলো কাঁঠাল বিরিয়ানি। মাংসের বিরিয়ানির পাশাপাশি যারা নতুন স্বাদের চমক নিতে চান, তাদের জন্য কাঁঠাল বিরিয়ানি হতে পারে একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন। অনেকেই ভেবে নিশ্চই অবাক হবেন, কাঁঠাল দিয়ে আবার বিরিয়ানিও রান্না করা যায়! একবার খেলে মুখে লেগে থাকবে এই কাঁঠাল বিরিয়ানির স্বাদ। কাঁচা কাঁঠালের তরকারি তো কমবেশি সবাই নিশ্চই খেয়েছেন, এবার না হয় স্বাদ পাল্টাতে স্বাদ নিন কাঁঠাল বিরিয়ানির। মাংসের স্বাদকেও হার মানায় কাঁচা কাঁঠালের বিরিয়ানি। উপকরণ, পোলাও চাল ৩ কাপ, দই ১/২ কাপ, কাঁচা কাঁঠাল ২ কাপ, পেঁয়াজ কুচি ১ কাপ, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ২ চা চামচ, জিরা গুঁড়া ১ চা চামচ, ধনিয় গুঁড়া ১ চা চামচ, বিরিয়ানি মসলা ১ টেবিল চামচ, হলুদ গুঁড়া ১ চা চামচ, মরিচ গুঁড়া ১ চা চামচ, লবণ পরিমাণমতো, তেল আধা কাপ, কয়েকটি এলাচ, দারুচিনি ও তেজপাতা, কাঁচা মরিচ ১০ থেকে ১৫টি, বেসন ১ টেবিল চামচ, ঘি এক টেবিল চামচ। প্রস্তুত প্রণালী, প্রথমে পোলাও চাল ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন। এরপর কাঁচা কাঠালের খোসা ফেলে টুকরা করে কেটে নিন। কাঁঠালের টুকরাগুলো সামান্য হলুদ, মরিচ, জিরার গুঁড়া, দই, আদা ও রসুন বাটা, লবণ, বেসন মিশিয়ে ভালো করে মেখে আধা ঘন্টা রেখে দিন মেরিনেশনের জন্য। এরপর প্যানে হালকা তেল গরম করে কাঁঠালের টুকরাগুলোর দুপাশ হালকা ভেজে নিন। এবার আরও একটু তেল গরম করে পেঁয়াজ ভেজে অর্ধেক তেলও অর্ধেকটা ভাজা পেঁয়াজ তুলে রাখুন। এদিকে গরম মসলা ও বাটা মসলা প্যানে দিয়ে ভাজতে থাকুন। গুঁড়া মসলা, লবণ ও সামান্য পানি দিয়ে মসলা কষিয়ে নিন। কিছুক্ষণ পর ভাজা কাঁঠাল ও ১ কাপ পানি দিয়ে নেড়েচেড়ে ঢেকে দিন। পানি শুকিয়ে তেল ওপরে উঠে এলে কাঁঠালের টুকরাগুলো তুলে নিন। পেঁয়াজ ভাজার বাকি তেল ঢেলে দিন। এবার পোলাও চাল ওই তেলে কয়েক মিনিট ভাজুন। এরপর ১ কাপ গরম পানি দিয়ে মাঝারি আঁচে ঢেকে দিন। পানি অর্ধেক শুকিয়ে এলে কাঁঠালের টুকরো, কাঁচা মরিচ ও পরিমাণ মতো লবণ দিয়ে নেড়েচেড়ে চুলার আচ কমিয়ে দমে রাখুন। চাল সেদ্ধ হয়ে পানি শুকিয়ে গেলে উপড়ে ১ টেবিল চামচ ‍ঘি ও পেঁয়াজ বেরেস্তা ছড়িয়ে আরও কয়েক মিনিট হালকা আঁচে দমে রাখুন। এরপর চুলা বন্ধ করে ‍দিন।

কাঁঠালের বিচির ভর্তা

গ্রামবাংলার একটি সুপরিচিত ও সুস্বাদু খাবার হল কাঁঠালের বিচির ভর্তা। এটি তৈরি করতে কাঁঠালের বিচিকে ভালোভাবে পরিষ্কার করে সেদ্ধ করে বা ভেজে নিতে হয়। তারপর বিচির খোসা ছাড়িয়ে পাটায় বেটে বা হাত দিয়ে চটকে  নিতে হয়। এবার চটকানো বিচির সাথে মরিচ, রসুন, ধনেপাতা ও পরিমাণমত লবণ দিয়ে মিশিয়ে নিতে হবে। তারপর খাঁটি সরিষার তেল দিয়ে ভালোভাবে মাখিয়ে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে সুস্বাদু কাঁঠালের বিচির ভর্তা। গরম ভাতের সাথে এই ভর্তার স্বাদ বেশ উপভোগ্য। 

চিংড়ি দিয়ে মজাদার কাঁঠালের রেসিপি

চিংড়ি দিয়ে কাঁঠাল বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু রেসিপি। বিশেষ করে কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে তৈরি এই পদটি গ্রাম বাংলার রান্নাঘরে বহুদিন ধরে জনপ্রিয়। কাঁচা কাঠালের রেসিপি এতটাই সুস্বাদু যে, কাঁচা কাঁঠালকে অনেকেই গাছের মাংশ বলে থাকেন। কারণ রান্নার পর এটিকে অনেকটাই মাংসের মতন লাগে। এছাড়া চিংড়ি ও কাঁঠাল একসাথে রান্না করলে প্রচুর পুষ্টিগুণও পাওয়া যায়। এতে চিংড়ি এবং কাঁঠালের পুষ্টি মিলে দ্বিগুণ পুষ্টি হয়ে যায়। বাঙালি ভোজনরসিক, তাই কাঁচা কাঁঠালকেও পাতে এনেছে। কাঁচা কাঁঠাল স্বাস্থ্যের জন্য খুব উপকারী। তবে কাঁঠাল দিয়ে চিংড়ি রান্না সবচেয়ে মজাদার জনপ্রিয় রেসিপিগুলোর মধ্যে একটি। চলুন জেনে নেওয়া যাক কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে সুস্বাদু চিংড়ির রেসিপি।উপকরণ, কাঁচা কাঁঠাল ১টি (ছোট বা মাঝারি আকারের), চিংড়ি আধা কাপ, লবণ পরিমাণ মতো, হলুদ গুঁড়া ১ চা চামচ, সরিষার তেল পরিমাণমতো, দারুচিনি পরিমাণ মতো, লবঙ্গ ৪টি, এলাচ ৪টি, তেজপাতা ২টি, পেঁয়াজ বাটা ১ চা চামচ, টমেটো বাটা ১ চা চামচ, আদা রসুন বাটা ১ চা চামচ, মরিচ বাটা ১/২ চা চামচ, জিরা গুঁড়া ১ টেবিল চামচ, ধনিয়া গুঁড়া ১ টেবিল চামচ, গরম মসলার গুঁড়া পরিমাণ মতো। প্রস্তুত প্রণালী, মাঝারি কাঁচা একটি কাঁঠাল কেটে নিন। এরপর ধুয়ে লবণ ও হলুদ ‍দিয়ে কিছুক্ষণ সেদ্ধ করে পানি ঝরিয়ে নিন। এরপর একটি প্যানে সরিষার তেল নিয়ে তাতে দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ ও তেজপাতা ফোড়ন দিন। এবার তাতে একে একে পেঁয়াজ বাটা, টমেটো বাটা, আদা রসুন বাটা, কাঁচা মরিচ বাটা, ধনে গুঁড়া, জিরা গুঁড়া, হলুদ গুড়া, মরিচের গুঁড়া ও পরিমাণ মতো লবণ দিয়ে ভালোভাবে কষিয়ে নিন। মসলা কষানো হলে তাতে চিংড়ি ও আগে থেকে সেদ্ধ করে রাখা কাঁচা কাঁঠালের টুকরা গুলো দিয়ে ভালো করে নেড়েচেড়ে নিন। তারপর একটি ঢাকনা দিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মতো ঢেকে রাখুন। চুলার আঁচ খুব বেশি রাখবেন না। অল্প একটু পানি দিন। মাঝে মাঝে ঢাকনা তুলে নেড়েচেড়ে দিবেন। নামানোর আগে গরম মসলার গুঁড়া ছিটিয়ে নামিয়ে নিন।

কাঁঠালের পুডিং

সুস্বাদু কাঁঠালের পুডিং খেতে অত্যন্ত মজাদার হয়। এটি দেখতে খুবই লোভনীয় হয়। সুস্বাদু কাঁঠালের পুডিং খান না, এমন মানুষ খুবই কম আছে। কাঁঠালের মিষ্টি স্বাদ ও মনোমুগ্ধকর সুবাস দিয়ে তৈরি করা হয় সুস্বাদু কাঁঠালের পুডিং।  এটি স্বাদে একদম অন্যরকম আকর্ষণীয় একটি ডেজার্ট। পুডিং তৈরি করতে পাকা কাঁঠালের কোয়া থেকে বিচি ও আঁশ আলাদা করে ভালোভাবে ব্লেন্ড করে নিতে হয়। এরপর দুধ, চিনি ও কাঁঠালের মিশ্রণ একসাথে ভালোকরে মিশিয়ে পুডিংয়ের মিশ্রণ তৈরি করা হয়। এবার মিশ্রণটি ছাঁচে ডেলে ভাপে বা ওভেনে প্রয়োজন মত রান্না করলে তৈরি হয়ে যাবে নরম ও সুগন্ধি কাঁঠালের পুডিং। কাঁঠালের পুডিং ঠান্ডা করে পরিবেশন করলে এর স্বাদ আর ভালো হয়।

কাঁঠালের পিঠা

কাঁঠালের পিঠা আমাদের গ্রামীণ রান্নার সংস্কৃতিতে বিশেষ একটি স্থান দখল করে আছে। কাঁঠাল বাংলার গীষ্মকালীন ফলগুলোর মধ্যে একেবারে আলাদা এক ভালোবাসার নাম। পাকা কাঠালের মিষ্টি ঘ্রাণ, রসালো স্বাদের অনুভূতি যেন গ্রামের মাটির সঙ্গে মিশে থাকা এক টুকরা স্মৃতি। আর সেই কাঁঠাল যখন পিঠার আকারে রুপ নেয়, তখন তা শুধু খাবার থাকে না, হয়ে ওঠে উৎসব, ঐতিহ্য আর ঘরোয়া উষ্ণতার এত অনন্য মিলন। কাঁঠালের পিঠা শুধু স্বাদের জন্যই নয়, এর পুষ্টিগুণের জন্যও বেশ পরিচিত। পিঠা খাওয়ার মাধ্যমে কাঁঠালে থাকা ভিটামিন, খনিজ ও শর্করা শরীরে শক্তি যোগায়। পিঠা পার্বন, পারিবারিক আয়োজন বা অতিথি আপ্যায়নে কাঁঠালের পিঠা একটি বিশেষ আকর্ষণ। পাকা কাঁঠালের রস, নারকেল, চালের গুঁড়া আর খেজুরের গুড়ের মিশেলে তৈরি এই পিঠা যেমন সুস্বাদু, তেমনি সহজ উপাদানেই তৈরি করা যায়। উপকরণ, পাকা কাঁঠাল ১৫ থেকে ২০ কোয়া, চালের গুড়া ১ কাপ, চিনি অথবা গুড় আধা কাপ, নারিকেল কোরা আধা কাপ, লবণ সামান্য বা পরিমাণ মতো, পানি পরিমাণ মতো, তেল পরিমাণ মতো (ভাজার জন্য)। প্রস্তুত প্রণালী, প্রথমে কাঁঠালের বীজ বাদ দিয়ে কোয়া থেকে রস বের করে নিন। এরপর সেই রসের সঙ্গে চালের গুঁড়া, চিনি অথবা গুড়, নারিকেল, সামান্য লবণ এবং প্রয়োজন মতো পানি মিশিয়ে একটি ঘন মিশ্রণ তৈরি করুন। তারপর চুলায় একটি কড়াইয়ে তেল গরম করুন। তেল গরম হয়ে এলে মিশ্রণ থেকে অল্প অল্প করে গোলা তুলে বড়ার মতো আকারে তেলে দিয়ে সোনালি রঙ ধারণ না করা পর্যন্ত ভেজে নিন। ব্যস তৈরি হয়ে গেলে লোভনীয় স্বাদের কাঁঠালের পিঠা। 

কাঁঠালের সুস্বাদু নিরামিষ

কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল। কাঁঠাল দিয়ে বানানো যায় বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু নিরামিষ। কাঁঠালের কোষ, বিচি ও খোসা সবকিছু ‍দিয়েই কাঁঠালের নিরামিষ তৈরি করা যায়। আর এই নিরামিষে রয়েছে প্রচুর পুষ্টিগুণ। কারণ কাঁচা ও পাকা উভয় ধরনের কাঁঠালেই রয়েছে ভিটামিন এ,  ভিটামিন সি। কাঁঠালে থাকা ভিটামিন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, আমাদের ত্বক ভালো রাখে, এবং চোখের স্বাস্থ্য রক্ষায় সাহায্য করে। কাঁঠাল প্রাকৃতিক শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ এটি শুধু সুস্বাদু নয়, পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। বৃষ্টির দিনে কাঁঠালের নিরামিষের সাথে গরম গরম ভাত আহ কি আয়েস, এটি যারা খেয়েছেন তারাই একমাত্র বুজবেন। এটি অনায়াসেই একটি পদ হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া এটি খিচুরির সঙ্গেও খেতে দারুন লাগে।  কাঁঠালের নিরামিষ  তৈরির উপকরণ, কাঁচা কাঁঠাল ২ কাপ, আলু, বররটি ১ কাপ (আপনার পছন্দমতো যেকোনো সবজি), শুকনা শিমের বিচি ১ টেবিল চামচ, পেঁয়াজ কুচি ১/২ কাপ, তেল ২ টেবিল চমিচ বা পরিমাণ মতো, পেঁয়াজ বাটা ১ চা চামচ, আদা বাটা ১ চা চামচ, রসুন বাটা আধা চা চামচ, জিরা ও ধনে গুঁড়া ১ চা চামচ, হলুদ গুঁড়া ১ চা চামচ, মরিচ গুঁড়া ১ চা চামচ, লবণ স্বাদ মতো, পাঁচফোড়ন আধা চা চামচ, শুকনা মরিচ ৩ থেকে ৪ টি। প্রস্তুত প্রণালী, প্রথমে একটি প্যানে তেল গরম করুন। তারপর  উপকরণের সব মসলাগুলি ভালোভাবে কষিয়ে নিন। এবার প্যানে কাঁচা কাঁঠালের টুকরা দিয়ে নাড়ুন। কয়েক মিনিট নেড়েচেড়ে ১ কাপ পানি দিয়ে ঢেকে দিন। ১০ মিনিট পরে বাকি সবজি গুলো দিয়ে নেড়েচেড়ে আবার ঢেকে দিন। প্রয়োজনে সামান্য পানি দিয়ে দিন। সবজি সেদ্ধ হয়ে এলে অন্য পাত্রে ১ চা চামচ তেলে পেঁয়াজ কুচি, শুকনা মরিচ ও পাঁচফোড়ন ভেজে নিরামিষের ওপর ঢেলে দিন। এবার পরিবেশন করুন সুস্বাদু কাঁঠালের নিরামিষ। 

কাঁচা ও পাকা কাঁঠাল স্বাদে ও পুষ্টিতে ভিন্ন

কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল। এটি বিশ্বের একটি বৃহত্তম ফল। কাঁঠাল আমাদের ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাতীয় ফল কাঁঠাল শুধু সুস্বাদু নয়, এটি পুষ্টিগুণেও ভরপুর। মজার বিষয় হলো, কাঁঠালের কাঁচা ও পাকা দুই রূপেরই রয়েছে আলাদা আলাদা উপকারিতা। একদিকে কাঁচা কাঁঠাল রান্না করে সবজি হিসেবে খাওয়া হয়, অন্যদিকে পাকা কাঁঠালের মিষ্টি ও রসালো কোষ গ্রীষ্মের অন্যতম আকর্ষণ। 
কাঁচা কাঁঠাল, কাঁচা কাঁঠালকে সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। কাঁচা কাঁঠালে প্রচুর খাদ্য আঁশ থাকে, যা হজমশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে। এটি দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহায়ক। বর্তমানে অনেক দেশেই কাঁচা কাঁঠালকে ভেজিটেবল মিট বা মাংসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আজকাল কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক রেসিপি বানানো যায়। তাছাড়া কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে ঐতিহ্যবাহী খাবারতো আছেই। কাঁচা কাঁঠাল প্রচুর মাইক্রোমিনারেল ক্যারি করে। ভিটামিন এ থেকে শুরু করে প্রায় সব ভিটামিনই আমরা কাঁচা কাঁঠালে পাই। পাকা কাঁঠাল, পাকা কাঁঠাল শক্তির প্রাকৃতিক উৎস। পাকা কাঁঠালে প্রাকৃতিক শর্করা বেশি থাকে, যা দ্রুত শক্তি যোগায়। গ্রীষ্মের ক্লান্তি দূর করতে পাকা কাঁঠাল বেশ কার্যকর। এর মিষ্টি স্বাদ শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার কাছেই সমান জনপ্রিয়। ভিটামিন সমৃদ্ধ, কাঁচা ও পাকা উভয় ধরনের কাঁঠালেই রয়েছে ভিটামিন এ এবং ভিটামিন সি। এসব ভিটামিন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, ত্বক ভালো রাখে এবং চোখের স্বাস্থ্য রক্ষায় সাহায্য করে। হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, কাঁঠালে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। ফলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুকি কমাতে এটি সহায়ক হতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য, পাকা কাঁঠালে চিনির পরিমাণ বেশি হওয়ায় ডায়াবেটিস রোগীদের সতর্ক থাকতে হবে। তবে কাঁচা কাঁঠাল তুলনামূলক ভাবে নিরাপদ এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। 

শিশুদের জন্য কাঁঠালের মজাদার খাবার

কাঁঠাল শুধু সুস্বাদু ফলই নয়, এটি শিশুদের জন্য নানা ধরনের পুষ্টিকর ও মজাদার খাবার তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়। অনেক শিশুরা কাঁঠাল খেতে একদমই পছন্দ করে না, তবে কাঁঠালকে ভিন্নভাবে  আকর্ষণীয় করে তৈরি করলে শিশুরা আনন্দের সঙ্গে কাঁঠাল খেতে আগ্রহী হবে। যেমন পাকা কাঁঠালের স্মুদি, কাঁচা কাঁঠালের কাটলেট, কাঁঠালের পায়েস, কাঁঠালের পিঠা, কাঁঠালের জ্যাম ও জেলি, কাঁঠালের চিপস, কাঁঠালের আইসক্রিম, কাঁঠালের কেক, কাঁঠালের মিল্কশেক, কাঁঠালের কুলফি, কাঁঠালের হালুয়া এবং কাঁঠালের লাড্ডু। অনেক শিশুরই প্রিয় ফল কাঁঠাল। জাতীয় ফল হিসেবে পরিচিত এই ফলটি স্বাদ, গন্ধ এবং পুষ্টিগুণের জন্য সমানভাবে সমাদৃত। অনেক শিশু পাকা কাঁঠাল সরাসরি খেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। তাদের জন্য এই সুস্বাদু ফল দিয়ে তৈরি করা যায় নানা ধরনের সুস্বাদু লোভনীয় খাবার। ঘরোয়া রান্না থেকে শুরু করে আধুনিক ফিউশন রেসিপি সহ প্রায় সব কিছুতে কাঁঠালের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী খাবারের তালিকায় কাঁঠালের পিঠার নাম বেশ পরিচিত। পাকা কাঁঠালের রসের সাথে চালের গুঁড়া, ময়দা, চিনি ও সামান্য লবণ মিশিয়ে তৈরি করা যায় সুস্বাদু বড়া পিঠা। এছাড়া আরও নানা ধরণের পিঠা বানানো যায়, যা শিশুরা খুব আগ্রহের সাথে খেতে পারে। শিশুদের জন্য আরেকটি মজাদার খাবার হলো কাঁঠালের পায়েস। দুধ, চাল, চিনি এবং কাঁঠালের রস দিয়ে তৈরি করা যায় মজাদার পায়েস। গরমের ‍দিনে ঠান্ডা কাঁঠালের স্মুদি বা জুস শিশুর শরীরকে সতেজ রাখে। কাঁঠালের কোষের সঙ্গে দুধ, দই কিংবা বরফ মিশিয়ে ব্লেন্ড করলে তৈরি হয় পুষ্টিকর পানীয়। চাইলে এতে মধুও যোগ করতে পারেন। পাকা কাঁঠালের শাঁস, চিনি ও লেবুর রস দিয়ে জ্বাল করে তৈরি করা যায় জ্যাম বা জেলি। এটি শিশুরা খুব আয়েশ করে খায়। অনেকেই মনে করেন চিপস শুধু কাঁচা কাঁঠাল দিয়েই তৈরি করা হয়। তবে পাকা কাঁঠালের কোষ পাতলা করে কেটে রোদে শুকিয়ে বা হালকা ভেজে তৈরি করা যায় মচমচে চিপস। বর্তমানে কাঁঠালের আইসক্রিম বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কাঁঠালের পিউরি, দুধ, ক্রিম ও চিনি একসঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করা যায় সুস্বাদু আইসক্রিম। কাঁঠাল দিয়ে তৈরি করা যায় নরম ও সুস্বাদু কেক। কাঁঠালের পেস্ট কেকের ব্যাটারে মিশিয়ে কেক করলে কেকে একটি বিশেষ সুগন্ধ ও মিষ্টি স্বাদ যোগ হয়।  

কাঁঠালের পুষ্টিগুণ

গ্রীস্মের রসালো ফল কাঁঠালে এখন বাজার সয়লাব। সব বয়সী নারী ও পুরুষের জন্য এই ফল খুব উপকারী। কাঁচা ও পাকা সব অবস্থাতেই কাঁঠাল খাওয়া যায়। সবজি হিসেবে কাঁচা কাঁঠালের কদর খুব বেশি। তবে মিষ্টি পাকা কাঁঠালের স্বাদও অতুলনীয়। বর্তমানে কাঁঠাল শুধু সরাসরি খাওয়া নয়, এটি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় খাবার তৈরি করা যায়। যারা কাঁঠাল খান না, তারাও কাঁঠালের বিভিন্ন মুখরোচক রেসিপি খুব স্বাদ করে খেতে পারেন। কাঁঠাল খাওয়া আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভালো। কাঁঠালে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি ও ভিটামিন রয়েছে, যা আমাদের পুষ্টির ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে। শুধু কাঁঠাল নয় কাঁঠালের বিচি ও আমাদের শরীরের জন্য উপকারি। বাংলাদেশে কাঁঠাল সহজলভ্য হওয়ায় এটি আমাদের সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। এবার জেনে নিন কাঁচা ও পাকা দুই রকম কাঁঠালের পুষ্টিগুণ। কাঁচা কাঁঠালের পুষ্টিগুণ, প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁঠালে আছে ৮৪ গ্রাম জলীয় অংশ, খনিজ পদার্থ ০.৯ গ্রাম, ফাইবার ২.৮ গ্রাম, খাদ্যশক্তি ৫১ কিলোক্যালরি, প্রোটিন ২.৬ গ্রাম, ফ্যাট ০.৬ গ্রাম, কার্বোহাইড্রেট ১১.৫ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৭৩.২ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ৫৭.২ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ৩২.৩ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম ৩৫.০ মিলিগ্রাম, আয়রন ১.৯ মিলিগ্রাম, আইইউ ভিটামিন এ ৩০, ভিটামিন সি ১৪.০ মিলিগ্রাম। পাঁকা কাঁঠালের পুষ্টিগুণ, প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা কাঁঠালে আছে ৭৭.০ গ্রাম জলীয় অংশ, ১.২ গ্রাম প্রোটিন, ০.২ গ্রাম ফ্যাট, ১৩.৩ গ্রাম কার্বেোহাইড্রেট, ১.১ গ্রাম ফাইবার, ১৩ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৪১ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ২৬৮ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ১ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ০.৩ মিলিগ্রাম আয়রন, ২ আইইউ ভিটামিন -এ, ৩.৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ২০.৬ গ্রাম চিনি, ম্যাগনেসিয়াম ২৭ মিলিগ্রাম, আর খাদ্য শক্তি পাই ৭২ কিলোক্যালরি। লেখক পুষ্টিবিদ

কাঁঠালের স্বাস্থ্য উপকারিতা

কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল হিসেবে পরিচিত। কাঁঠাল একটি পুষ্টিকর সমৃদ্ধ ফল যার অসংখ্য স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে। দক্ষিণ পশ্চিম ভারতের একটি বহিরাগত গীষ্মমন্ডলীয় ফল কাঁঠাল, এর অসংখ্য স্বাস্থ্য উপকারিতার জন্য এটি উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সুমিষ্ট এই ফলটি পুষ্টিগুণে ভরপুর। কাঁঠালের মৌসুমে নিয়মিত এই ফলটি খেলে পাওয়া যাবে অনেক উপকার। কাঁঠালের উপকারিতা, কাঁঠাল শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। হজম শক্তি উন্নত করে। কাঁঠালে থাকা আয়রন রক্তসল্পতা দূর করতে সহায়তা করে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় কাঁঠালে থাকা ভিটামিন সি। ত্বক উজ্জ্বল ও স্বাস্থ্যকর রাখে। কাঁঠালে আছে ভিটামিন বি৬ যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। কাঁঠালে থাকা ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম হাড় মজবুত করে। কাঁঠালে থাকা পটাশিয়াম ‍উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কাঁঠালে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক এবং শরীরের টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে। শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখে। হার্টের অসুখ থেকে দূরে রাখে। দাঁতের মাড়ি শক্তিশালী করে। টেনশন এবং নার্ভাসন কমাতে পারে। কাঁঠাল খেলে ক্ষুধা কম লাগে, অনেক্ষণ পর্যন্ত পেট ভরা রাখে। ফলে ওজন কমতে থাকে। ফাইবারের ভালো একটি উৎস কাঁঠাল আর এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে কাঁঠালে চর্বি কম, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে। দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে। আলসারের সমস্যা প্রাকৃতিক উপায়ে কমাতে সাহায্য করে কাঁঠালে থাকা এক ধরনের উপকারী উপাদান। ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়। ত্বকের যত্ন নেয়। কাঁঠাল অপুষ্টিজনিত সমস্যা রাতকানা এবং রাতকানা থেকে অন্ধত্ব প্রতিরোধ করার জন্য খুবই উপযোগী ফল। দুগ্ধদানকারী মা তাজা পাকা কাঁঠাল খেলে দুধের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। কাঁঠালের উপকারিতা অসীম।

কাঁঠাল খাওয়ার সতর্কতা

কাঁঠাল একটি উপকারী ফল। নানা ধরনের খনিজ, ভিটামিন ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট রয়েছে কাঁঠালে। অর্থাৎ যেসব পুষ্টি মানুষের দেহে প্রয়োজন তার প্রায় সবই কাঁঠালে আছে। কাঁঠাল শুধু গরম ও বর্ষাকালের জনপ্রিয় ফল নয়, এটি বেশ কিছু অবিশ্বাস্য স্বাস্থ্যগত উপকারিতাও প্রধান করে। তবে অতিমাত্রায় খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা থাকে। কাঁঠালে রয়েছে প্রচুর পুষ্টিগুণ, তবে এসব গুণের পাশাপাশি কাঁঠালের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। যেমন বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু কিছু মানুষের পরাগরেণুর কারণে কাঁঠালে অ্যালার্জি  হতে পারে, যেমন মুখ ফুলে যাওয়া, চুলকানি ইত্যাদি। কাঁঠালের বীজে কিছু রাসায়নিক থাকতে পারে, যা অতিরিক্ত খেলে ডায়রিয়া বা গ্যাস্ট্রিক সমস্যা বাড়াতে পারে। কাঁঠালে রয়েছে উচ্চ পটাশিয়াম, যা দীর্ঘমেয়াদী কিডনি রোগীদের জন্য ক্ষতিকর। অধিক পটাশিয়াম হাইপারক্যালেমিয়ার কারণ হতে পারে, যা হৃদরোগ বা পক্ষাঘাতের সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দেয়। যাদের রক্ত সংক্রান্ত কোনো রোগ আছে তাদের কাঁঠাল খাওয়া একেবারেই উচিত নয়। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বা যারা প্রিডায়াবেটিস সেকশনে রয়েছেন তারা বেশি কাঁঠাল খেলে ক্ষতি হওয়ার ভয় বেশি রয়েছে। কারণ কাঁঠালের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অনেক বেশি। যে কারণে কাঁঠাল খেলে ব্লাড সুগার বৃদ্ধি পায় দ্রুত। সার্জারির পর অতিরিক্ত কাঁঠাল খেলে বিভিন্ন সমস্য দেখা দিতে পারে। তাই সতর্ক থাকতে হবে। সার্জারির পরপর সব রোগীকেই কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। কাঁঠাল খেলে তা সেবন ওষুধের সাথে বিক্রিয়া করতে পারে। তাই সার্জারির আগে ও পরে কাঁঠাল খাওয়া থেকে বিরত থাকবেন। গর্ভাবস্থায় কাঁঠাল খেলে খুব বেশি সমস্যা হয় না। তবে অতিরিক্ত কাঁঠাল খেলে ‍কিন্তু এসময় জটিলতা বাড়েতে পারে।

কাঁঠাল একটি উপকারী ফল। তীব্র গরমের শেষে যখন আষাঢ়ের ধারায় প্রকৃতি শান্ত হয়, তখনই বাংলার ঘরে ঘরে সুবাস ছড়ায় এক বিশেষ ফল। এর সুমিষ্ট কড়া গন্ধই বলে ‍দেয়, এটি আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল। নানা ধরণের খনিজ, ভিটামিন ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট রয়েছে এই কাঁঠালে। অর্থাৎ যেসব পুষ্টি মানুষের দেহে প্রয়োজন তার প্রায় সবই কাঁঠালে আছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কাঁঠাল খেলে হজমশক্তি ভালো হয়, সেই সঙ্গে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থেকেও মুক্তি দেয়। হৃদরোগ, কোলন ক্যানসার এবং পাইলসের সমস্যায় কাঁঠাল অত্যন্ত উপকারী বলা হয়। এজন্যই বাঙালিরা পুষ্টির অভাব পূরণ করার জন্য কাঁঠাল খেয়ে থাকেন। শুধু তাই নয় কাঁঠাল পুষ্টির রাজা এবং গরিবের খাদ্য হিসেবে পরিচিত। কাঁঠালে আছে অনেক ভেষজগুণ। নিয়মিত কাঁঠাল খেলে অস্টেওপরোসিস নামক এক প্রকার হাড়ের রোগ প্রতিরোধ হয়, সে সাথে এর গঠনকে করে সুদৃড়। কাঁঠালের বিচিতে প্রচুর পরিমাণে হিমোগ্লোবিন থাকায় শরীরের রক্ত সল্পতা দূর হয়। তাই গ্রীষ্মের ভরা মৌসুমে পরিমাণমতো কাঁঠাল খেয়ে নিজে সুস্থ থাকি, অপরকেও সুস্থ  রাখি। তবে যেকোনো খাবারই অতিরিক্ত খাওয়া ক্ষতিকর। কাঁঠাল অত্যন্ত ভারী ফল, তাই অতিরিক্ত খেলে হজমে সমস্যা হতে পারে। যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের কাঁঠাল খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ  নেওয়া উচিত, কারণ এটি দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url