ভেতর থেকে রূপচর্চার যত্ন, কেন প্রয়োজন সুষম খাবার ?

রূপচর্চা মানে শুধু বাইরের প্রোডাক্ট ব্যবহার করলেই হয় না। রূপচর্চা মানেই কেবল দামী ক্রিম বা ফেসওয়াশ মাখা নয়। ভেতর থেকেও পুষ্টি দরকার। সুন্দর ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ত্বক, চুল ও নখের জন্য শরীরের ভেতর থেকেও পুষ্টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আপনার ত্বকের আসল উজ্জ্বলতা আসে ভেতর থেকে। আপনি যা খান, তার সরাসরি প্রতিফলন ঘঠে আপনার চেহারায়। সুষম খাবার ত্বক, চুল ও নখকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেলে ত্বক তার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে পারে, চুলের গোড়া শক্ত হতে সাহায্য করে এবং শরীরও সুস্থ থাকে। প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল ও স্বাস্থ্যকর চর্বি ত্বকের কোষ ঠিক রাখতে সাহায্য করে। আমাদের জীবনে সুষম খাবার রূপচর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ। রূপচর্চায় সুষম খাবার ত্বক ও চুলকে স্বাস্থ্যবান রাখে এবং শরীরের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা বজায় রাখে। সুষম খাবার পুষ্টি ঘাটতি থেকে বিরত রাখে ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। তাছাড়া শুধু সৌন্দর্য নয়, শরীর সুস্থ রাখতেও সুষম খাবার গ্রহণ করতে হবে। দেহের বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ, তাপ উৎপাদন করার জন্য ও নিজেদের কর্মক্ষম রাখতে সুষম খাবারের বিকল্প নেই। খাদ্যের প্রধান উপাদান ছয়টি। শর্করা, আমিষ, স্নেহ বা চর্বি জাতীয় খাবার, ভিটামিন, খনিজ, লবণ ও পানি। এগুলো খাবারের তালিকায় সঠিক অনুপাতে উপস্থিত থাকলে তাকে সুষম খাদ্য বলে। নিয়মিত সুষম খাদ্য গ্রহণ করলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং আমাদের শরীরের সৌন্দর্য বাড়াতে সহায়তা করে।


ভিটামিন সি ত্বক উজ্জ্বল রাখতে সহায়তা করে। আর ভিটামিন ই ত্বককে ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। আয়রন ও প্রোটিনের অভাব হলে চুল পড়া বাড়তে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান করাও খুব জরুরি, কারণ পানি ত্বককে হাইড্রেটেড রাখে। ফল, সবজি, ডাল, মাছ, ডিম ও বাদাম নিয়মিত খেলে স্বাভাবিক ভাবেই ত্বকে গ্লো আসে। তাই রূপচর্চায় ভালো ফল পেতে চাইলে সুষম খাবারকে প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত করা দরকার। বাইরে থেকে লোশন, ক্রিম বা পাউডার মাখলে ত্বক সাময়িক নরম হয়, কিন্তু শরীর ভেতর থেকে হাইড্রেটেড না থাকলে ত্বক খসখসে দেখায়। সুষম খাবারে থাকা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট যেমন অ্যাভোকাডো, ওলিভ ওয়েল বা বাদাম ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কাজ করে। বেদানা আর ভিটামিন ই জাতীয় খাবার খেলে, রূপচর্চা যারা করে তাদের জন্য খুবই ভালো। শুধু তাই নয়, সুষম খাদ্য এমন কিছু পুষ্টি সরবরাহ করে যা দেহের বৃদ্ধি এবং শরীরের সমস্ত ফাংশন যেমন শ্বাস প্রশ্বাস, খাদ্য হজম এবং উষ্ণ রাখার জন্য শক্তি প্রধান করে। তাই বাহ্যিক রূপচর্চার পাশাপাশি প্রতিদিনের খাবারে পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাবার রাখা উচিত। ভেতর থেকে সুস্থ শরীরই সুন্দর ও সতেজ চেহারার অন্যতম ভিত্তি।

সুষম খাবার কি এবং কেন এটি গুরুত্বপূূূর্ণ?

সুষম খাবার আমাদের শরীরের জন্য একটি ভালো ও স্বাস্থ্যকর খাবার। নিয়মিত সুষম খাবার খেলে আমাদের শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় এবং দৈনন্দিন কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি পাওয়া যায়। সুস্থ থাকার জন্য সুষম খাদ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে সকল খাদ্যে সকল প্রকার খাদ্য উপাদান একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ও সঠিক অনুপাতে বিদ্যমান থাকে এবং দেহে যাবতীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে, তাকে সুষম খাদ্য বলে। অর্থাৎ, যেসব খাদ্যে পরিমিত পরিমাণে শর্করা, আমিষ, স্নেহ, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি এ ছয়টি উপাদান উপস্থিত থাকে, তাই সুষম খাদ্য। সুষম খাদ্যের মধ্যে, খাদ্যের সকল উপাদান একটি পরিমিত মাত্রায় বিদ্যমান থাকে। সুষম খাদ্য গ্রহণে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সুস্থ থাকার জন্য সুষম খাদ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হলো সঠিক পরিমাণে বিভিন্ন খাবার খাওয়া যাতে আপনার শরীর তার প্রয়োজনীয় খাবার পায়। এর মধ্যে রয়েছে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, চর্বি, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ এবং জল। একটি ভালো খাদ্যাভ্যাস আপনার শরীরকে বৃদ্ধি করতে, শক্তিশালী রাখতে, অসুস্থতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং দৈনন্দিন কাজের জন্য শক্তি পেতে সাহায্য করে। প্রতিদিন স্বাস্থ্যকর বা সুষম খাবার খাওয়া হল সুস্থ জীবন যাপনের প্রথম ধাপ। পুষ্টিকর খাবার হরমোন নিয়ন্ত্রণ করতে এবং চাপ কমাতে সাহায্য করে, আপনার মেজাজকে ইতিবাচক এবং স্থিতিশীল রাখে। শর্করা আমাদের শরীরে শক্তি সরবরাহ করে, প্রোটিন কলা গঠন ও মেরামত করে, চর্বি মস্তিস্কের কার্যকারিতা এবং হরমোন উৎপাদনে সহায়তা করে, ভিটামিন ও খনিজ শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রমে সহায়তা করে এবং আঁশ হজমে সাহায্য করে ও ক্ষয় প্রতিরোধ করে। তাই আমাদের সুস্থ জীবনে সুষম খাবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

ভেতর থেকে রূপচর্চা কী ?

ভেতর থেকে রূপচর্চা হলো এমন একটি জীবনযাপন পদ্ধতি,  যেখানে কোনো কসমেট্রিক্স, দামি ক্রিম বা লোশন নয়, এটি সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং শারীরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরকে ভেতর থেকে সুস্থ  ও সতেজ রাখা। সঠিক খাবারের অভ্যাস এবং প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা এটি আমাদের ভেতর থেকে সতেজ রাখে। মনে রাখবেন, ত্বককে যদি ভালো করতে হয়, সেটা কিন্তু একেবারে ভেতর থেকে করতে হয়। সেই কারণেই আমাদের খাবারের অভ্যাসটি ‍যেন ভালো হয়, সেটিও আমাদের খেয়াল করতে হবে। অর্থাৎ আমাদের খাবারে যেন প্রচুর পরিমাণে ফলমূল থাকে, শাকসবজি থাকে, বিভিন্ন ধরনের বাদাম থাকে, ভাজাপোড়া, তেলযুক্ত খাবার এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার এগুলো কিন্তু আমাদের এড়িয়ে চলতে হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে ত্বকের শুষ্কতা বা ডিহাইড্রেশন এড়াতে, শুষ্কতা বিশেষ করে ত্বককে অনেক বেশি রাফ করে ফেলে। এটা এড়াতে কিন্তু আমাদেরকে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে। প্রতিদিন অন্তত সাত থেকে আট গ্লাস পানি নিয়ম করে পান করতে হবে। এই সঠিক খাবারের অভ্যাস এবং প্রচুর পরিমাণে পানি পানের যে অভ্যাসটা এই দুটো কিন্তু আমাদের প্রস্রাবকে ভালো রাখবে এবং আমাদের বাওয়েল মুভমেন্টও হবে। সেটাও কিন্তু আমাদের ত্বককে ভালো রাখতে অনেক সাহায্য করবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম, মানসিক চাপ মুক্ত জীবন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও পরিমিত পানি পান করার মাধম্যে চেহারায় প্রাকৃতিক গ্লো আসবে, ত্বক দেখাবে ফ্রেশ, আমাদের লোকটাও দেখাবে ফ্রেশ। অর্থাৎ রূপচর্চা বা ত্বকের যত্ন মানে দামি দামি কসমেটিক্স এর ব্যবহার নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট অভ্যাসের পরিবর্তন। 

সুন্দর ও স্বাস্থ্যেজ্জ্বল চুলের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি

আমরা সবাই চাই আমাদের চুল সুন্দর হোক। সৌন্দর্য প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ  একটি অংশ হলো চুল। কারণ সুন্দর ও স্বাস্থ্যেজ্জ্বল চুল আমাদের বাহিরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। কিন্তু চুল পড়া আমাদের একটি কমন সমস্যা। তাই সুন্দর চুল পেতে শুধু নিয়মিত হেয়ারপ্যাক ব্যবহার করলেই হবে না, এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে। খাদ্য তালিকায় প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো যুক্ত করে এই সমস্যা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই সুন্দর ও স্বাস্থ্যেজ্জ্বল চুল পেতে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খান, সুস্থ্য থাকুন। চুল পড়া রোধ, নতুন চুল গজানো এবং সুস্থ চুল পাওয়ার জন্য খাদ্য তালিকায় কিছু খাবার যুক্ত করা উচিত। খাবারগুলোর পুষ্টিগুণ দেওয়া হলো ডিম, ডিমের পুষ্টি উপাদান চুলের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করে। ডিমের সমৃদ্ধ জৈব প্রোটিন শরীরের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর মতোই চুলকেও পুষ্টি যোগায়। ডিমে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে জিংক, সেলেনিয়াম, সালফার ও আয়রন। আয়রন চুলের গুড়ায় রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে। পালংশাক, এই শাকে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, লৌহ ও ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিড আছে। এটি নিয়মিত খেলে আমাদের দেহে হিমোগ্লোবিন এর মাত্রা বাড়ে, যা চুলকে দ্রুত বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। শুধু পালংশাকই নয়, এমন নানা শাকই চুলের জন্য উপকারী। গাজর, প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ সমৃদ্ধ গাজর। গাজরের এই ভিটামিন মাথার ত্বক সিবাম নামের একটা তৈলাক্ত রাসায়নিক পদার্থ উৎপাদনে সাহায্য করে। এটা চুলের গোড়া সহ স্ক্যাল্পের শুষ্কতা রোধে উপকারী। সামুদ্রিক মাছ, সামুদ্রিক মাছে রয়েছে ওমেগা ৩ফ্যাটি অ্যাসিড। মাছের তেল চুলের জন্য বেশ উপকারী। মিষ্টি আলু, মিষ্টি আলু ভিটামিন এ এর  একটি ভালো উৎস। এতে থাকা ভিটামিন এ মাথার ত্বকে প্রয়োজনীয় তেল তৈরিতে সাহায্য করে। এর অভাব হলে মাথার ত্বকে চুলকানি ও খুশকির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।বাদাম, নানা ধরনের বাদামে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান এবং তেল ত্বক, চুল, মস্তিষ্ক ও হৃদপিন্ডের জন্য দারুণ উপকারী।  বাদামে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে বায়োটিন, যা আমাদের চুলকে সুস্থ রাখে। জিংক, মাংস, চিংড়ি, কাকড়া, বাদাম, দুধ, পনির ইত্যাদি খাবারে জিংক পাওয়া যায়। জিংকে থাকা এনজাইম চুল পড়া কমায়, ভঙ্গুরতা রোধ করে, নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে। টকজাতীয় ফল, মাল্টা, আমলকী, লেবু, কমলা, আঙুর, কাঁচা আম হলো টকজাতীয় ফল। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি আছে আর সুন্দর চুলের জন্য ভিটামিন সি খুব দরকারি।

সুন্দর ও মজবুত নখের জন্য  সুষম খাবার

নখ আমাদের হাতের সৌন্দর্য বাড়ায়। বিশেষ করে মহিলারা বা মেয়েরা নখ সুন্দর রাখতে চান। তবে নখের যত্ন সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আমাদের দেশের গরম, আর্দ্র জলবায়ুতে নখে ময়লা জমে সহজেই সংক্রমণ হতে পারে। সুন্দর মজবুত নখ শুধু আমাদের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এটি স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রতীকও। শরীরের নানা স্বাস্থ্যগত সমস্যার জানান দেয় ভাঙা ও দূর্বল নখ। অনেক সময় আবহাওয়া ও পানিদূষণের মতো কারণে নখের স্বাস্থ্য খারাপ হতে পারে। তবে ভালো খাদ্য ‍ও শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় সুষম পুষ্টির অভাবকেই নখ দুর্বল হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দাবি করেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ত্বক বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক ড. ডানা স্টার্ন। নখের স্বাস্থ্য বিষয়ে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, কয়েক ধরনের ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের সমন্বয়ে শরীরে সুষম পুষ্টি তৈরি হয়। নখের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন গুলো হল ভিটামিন বি, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, এবং ভিটামিন এ। বায়োটিন, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক ও আয়রন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই ভিটামিন যুক্ত খাবারগুলো হলো সবুজ শাকসবজি, সবুজ শাকসবজি আমাদের নখের সৌন্দর্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পালং শাক, ডাঁটা শাক, পুঁই শাক ইত্যাদি গাঢ় সবুজ পাতাযুক্ত শাক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সমৃদ্ধ। সবুজ সবজি  যেমন বাধাকপি, ব্রকলি ইত্যাদিতে আছে প্রচুর আয়রন, ফোলেট, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এ এবং ভিটামিন সি। আর এসব ভিটামিন ও পুষ্টি উপাদান নখ ভালো রাখতে সাহায্য করে। মাছ, প্রোটিন, ভিটামিন ডি, সেলেনিয়াম ও বি২, বি৩, বি৬ ও বি১২ ভিটামিনের ভালো উৎস। এসব মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট আমাদের নখ ফাটা, আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। গরুর কলিজা, ড. নুসবাউম বলেন, গরুর কলিজা বায়োটিন ও প্রোটিনের খুব ভালো উৎস। বায়োটিন কেরাটিন উৎপাদনে অবদান রাখে, যা নখকে ভেতর থেকে রাখে শক্তিশালী। সূর্যমুখীর বীজ, সূর্যমুখীর বীজ ম্যাগনেসিয়ামের দুর্দান্ত উৎস, যা দুর্বল ও ভঙ্গুর নখের সমস্যা সমাধানে আদর্শ খাবার। ডিম, ডিমে পাবেন প্রোটিন, বায়োটিন ও ভিটামিন ডি। যা নখ ও চুলের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভিটামিন ও খনিজের গুরুত্ব

ভিটামিন ও খনিজ উপাদন আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। ভিটামিন ও খনিজ আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে এবং বিভিন্ন কাজ স্বাভাবিক ভাবে পরিচালনা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ত্বক, চুল ও নখের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য ধরে রাখতে বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজের প্রয়োজন হয়। ভিটামিন এ আমাদের শরীরের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখে। ভিটামিন সি শরীরে কোলাজেন তৈরি করতে পারে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। ভিটামিন ডি আমাদের শরীরের হাড় মজবুত করতে সাহায্য করে। এছাড়া আয়রন, জিংক, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের মতো খনিজ উপাদানও শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যায় এমন খাদ্য গ্রহন করা উচিত। 


বয়সের ছাপ কমাতে সুষম খাবার 

বয়স বাড়া জীবনের স্বাভাবিক গতিতে চলতে থাকে, কেউ বয়সকে থামাতে পারবে না। তবে বয়সের ছাপ কত দ্রুত শরীরে ফুটে উঠবে, তা নির্ভর করে জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসের ওপর। আমরা অনেকেই বয়সের ছাপ কমাতে বা লুকাতে বিভিন্ন ধননের ক্রিম ব্যবহার করি, তবে ক্রিম স্থায়ী কোনো ফলাফল দিতে পারে না, বরং আরো ক্ষতি হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বাহ্যিক পরিচর্চা নয়, ভেতর থেকে শরীরকে পুষ্টি জোগানোই দীর্ঘদিন ত্বক ও শরীরকে তারুণ্যদীপ্ত রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও প্রদাহ বেড়ে গেলে কোলাজেন ও ইলাস্টিন দ্রুত ক্ষয় হতে শুরু করে। ফলে ত্বকে বলিরেখা, শুষ্কতা ও বয়সের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বিসমৃদ্ধ খাবার রাখা জরুরি। এমন কিছু খাবার সম্পর্কে চলুন জেনে নিই। সবুজ শাকসবজি, সবুজ শাকসবজিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে খনিজ উপাদান। এদের মধ্যে রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই। কোলাজেন তৈরির জন্য এসব খাবার জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্বক থেকে বলিরেখা দূর করতে চাইলে খাদ্যতালিকায় শাক রাখুন। পালং শাক, ব্রকলি, বাঁধাকপি, শালগম, শিম এসব বেশ উপকারি। টমেটো, সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি ত্বকের কোলাজেন ভেঙে দেয়। টমেটোতে থাকে প্রচুর লাইকোপেন। ত্বক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ত্বককে সূর্যের ক্ষতিকর থেকে রক্ষা করে। ফলে ত্বকে বলিরেখা পড়ে না। ত্বক থাকে টানটান। রসুন ও কাঁচা হলুদ, উচ্চ সালফারযুক্ত মশলা রসুন। এটি কোলাজেনের ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। আর হলুদকে বলা হয় পাওয়ার হাউস বা শক্তিঘর। রোজ সকালে খালি পেটে পানির সঙ্গে কয়েক টুকরা কাঁচা রসুন ও হলুদ খান। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। ত্বক থাকবে মসৃণ। ত্বকের বলিরেখা ও ক্ষত দূর করতে লেবু দারুণ কার্যককরী। প্রতিদিন সকালে চিনি ছাড়া এক গ্লাস লেবুর রস খেলে ত্বক সজীব থাকে। বিটরুট, বিটরুট উপকারি একটি সবজি। এতে রয়েছে ভিটামিন এ, সি, পটাশিয়াম ও সুপার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই উপাদানগুলো ত্বকের মৃত কোষকে দূর করে ত্বক পরিষ্কার রাখে। ত্বকের পোর বা ছিদ্রগুলো মেরামত করে। সামুদ্রিক মাছ, ওমেগা ৩ফ্যাটি অ্যাসিড ও ভিটামিন ডি রয়েছে সামুদ্রিক মাছে। এই উপাদানগুলো ত্বক কোমল ও হাড় মজবুত রাখতে সাহায্য করে।

ফল ও শাকসবজির ভূমিকা

ফল ও শাকসবজি আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফল ও শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, খনিজ, খাদ্যআঁশ, পানি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর আমাদের শরীর সুস্থ থাকলে এমনিতেই চেহারায় গ্লো আসবে, কোনো দামি ক্রিমের প্রয়োজন হবে না। আমরা যা খাই তাই আমাদের চেহারায় প্রতিফলিত হয়। নিয়মিত বিভিন্ন ফল ও শাকসবজি খেলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। বিভিন্ন ফলে ও শাকসবজিতে থাকা পুষ্টি ও ভিটামিন সি, ভিটামিন এ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বকের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। যেমন কমলা, আপেল,পেয়ারা, কলা, পেঁপে, আঙুর, পালংশাক, লালশাক, টমেটো, শসা ও অন্যান্য ফল এবং শাকসবজিতে থাকা ভিটামিন ও পুষ্টি উপাদান আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। 

সুস্থ শরীরই সুন্দর ত্বকের ভিত্তি 

সুস্থ শরীরই সুন্দর ত্বকের ভিত্তি। নিত্যদিনের জীবনযাপনে বা বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানে নিজেকে সুন্দর দেখানোর জন্য আমাদের কত-না চেষ্টা। আর এই চেষ্টার বড় একটা অংশ জুড়ে থাকে হরেক রকম মেকআপসামগ্রী, দামি ক্রিম, লোশন নানা রকম রাসায়নিক। অনেকে আবার দেশের বাহির থেকেও বিভিন্ন মেকআপ আনেন। এসবের প্রয়োগে উল্টো ত্বকেরই অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। অথচ ত্বকের ধরন যেমনই হোক না কেন, সৌন্দর্যবর্ধক পণ্য ছাড়াই যত্ন নেওয়া যায়। কারণ সৌন্দর্যের মূল রহস্য হলো সুস্থতা। শরীর সুস্থ থাকলে মন ভালো থাকে, আর মন ভালো থাকলে ত্বকও ভালো থাকে। ত্বকের বাহ্যিক রূপ মূলত আমাদের ভেতরের স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার প্রতিফলন। আমাদের ত্বক সুন্দর করতে হলে, আগে শরীর সুস্থ রাখতে হবে। সুস্থ ও সুন্দর ত্বকের জন্য কিছু মূল ভিত্তি দেওয়া হল পুষ্টিকর খাবার, সব ধরনের ত্বক ও শারীরিক গঠনের মানুষের জন্যই অতিরিক্ত তেল, ভাজা পোড়া, চিনি, লবণ, চর্বি  ও অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট ক্ষতিকর। শরীরের অতিরিক্ত চর্বি ও মোটা হয়ে যাওয়ার পেছনে মূলত এসব খাবারই দায়ী। ব্রণসহ ত্বকের নানা ধরনের সমস্যা তৈরি করে এসব খাবার। সুস্থ শরীর ও সুন্দর ত্বকের জন্য সুষম খাদ্য অপরিহার্য। ত্বকের রক্ষাণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিন ও ভিটামিন দরকার। তবে তার জন্য নিত্যনতুন খাদ্য সমপূরক গ্রহণ বা হরেক রকম রসনাবিলাসের প্রয়োজন নেই। খাদ্যতালিকায় স্বল্পমূল্যের তাজা ফল ও শাকসবজি রাখুন, যা আপনার শরীর সুস্থ রাখবে এবং ত্বককে পুষ্ট ও সজীব রাখবে। পর্যাপ্ত পানি খান, পানির অপর নাম জীবন। পানি হলো সব ধরনের সুস্থতার পূর্বশর্ত। ত্বকসহ পুরো শরীরের কোষগুলো সতেজ রাখার পাশাপাশি দেহের যাবতীয় বর্জ্য পদার্থ অপসারণের কাজও করে পানি। এসব বর্জ্য পদার্থের বড় অংশ হলো অ্যামোনিয়া, যা শরীরে জমে থাকলে বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ সৃষ্টি করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য ভোগায়। ফলে ত্বকে ব্রণ, ফুসকুড়ি, ছোপ ছোপ দাগ দেখা দেয়। কাজেই নিয়মিত ত্বকের বর্জ্য পদার্থ অপসারণের জন্য পর্যাপ্ত পানি পান করা দরকার। ঘাম ঝরান, দেহের বর্জ্য পদার্থগুলোর একটা বড় অংশ ঘাম হয়ে বেরিয়ে যায়। ত্বকের নিচে জমে থাকা ক্ষতিকর উপাদানগুলো বের হয় লোমকূপের মাধ্যমে ঘাম হিসেবে। তাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দৈনন্দিন কার্যক্রমের মাধ্যমে শরীরের ঘাম ঝরাতে হবে। প্রাণ খুলে হাসুন, হাসি আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদগুলোর একটি। চিকিৎসকরা বলেন হাসির মাধ্যমে হৃদপিন্ডে প্রচুর পরিমাণ রক্ত সঞ্চালিত হয়, ফুসফুসে অক্সিজেনের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়, দ্রুত গতিতে সংকুচিত ও প্রসারিত হয় পেটের পেশি। যা চেহারার গঠন সুন্দর রাখতে ও ত্বককে সতেজ রাখতে বড় ভূমিকা পালন করে। তাই মনভরে প্রাণখুলে হাসুন। গভীর ঘুম, সুস্থতা ও সৌন্দর্যের অন্যতম সহায়ক ঘুম। পর্যাপ্ত ঘুম শরীর সুস্থ রাখে আর শরীর সুস্থ থাকলে সৌন্দর্যও ঠিক থাকে। পর্যাপ্ত ঘুম শুধু চোখের নিচে কালো দাগ বা ত্বকের ছোপ ছোপ দাগই দূর করে না, বরং কোলাজেন উৎপাদনের মতো বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ত্বককে পুনরুজ্জীবিত করতেও সাহায্য করে। ইতিবাচক চিন্তা করুন, মুখ হলো মনের আয়না। মনের সুস্থতা চেহারায় ফুটে ওঠে। তাই মন ভালো রাখুন। আমরা যদি নিজের মনের ভেতর ভালো অনুভব করি, তাহলে আমাদের চেহারায় তা প্রকাশ পাবে। 

পানি পানের গুরুত্ব

পানির অপর নাম জীবন। পানি আমাদের শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। আমাদের শরীরের প্রায় সব গুরুতর কার্যক্রমে স্বাভাবিকভাবে চালানোর জন্য পর্যাপ্ত পানি প্রয়োজন। শরীরের তাপমাত্রা, খাবার হজম এবং শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ বের করে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করার অভ্যাস করা প্রয়োজন। রূপচর্চার ক্ষেত্রেও পানি পানের গুরুত্ব অসীম। শরীরে পানির ঘাটতি হলে ত্বক শুষ্ক ও নিষ্প্রাণ হয়ে যেতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান শরীরের স্বাভাবিক তরল ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। ফলে ত্বক স্বতেজ ও স্বাভাবিক থাকে। চেহারার গ্লো তৈরি হয়। পাশাপাশি চুল ও শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তৃষ্ণা পেলেই নয়, দিনের বিভিন্ন সময়ে নিয়মিত পানি পান করা শরীরের জন্য ভালো। 

চোখের সুস্থতায় সুষম খাবার

চোখ ভালো রাখা আমাদের সবার আগে জরুরি, চোখ ভালো মানেই জীবন সুন্দর। কারণ এই চোখ দিয়েই আমরা সুন্দর পৃথিবীটা দেখতে পাই। দিনের প্রতিটা সেকেন্ড আমাদের চোখ কাজ করে। সকালের খবরের কাগজ পড়া থেকে শুরু করে সারাদিনের প্রতিটা কাজে আমাদের চোখ ব্যবহৃত হয়। তবে চোখের প্রতি আমরা বেশিরভাগই অবহেলা করে থাকি। বিশেষ করে চোখের জন্য যেসব খাবার উপকারী, সেগুলোর প্রতি আমাদের খেয়াল থাকে কম। কিন্তু চোখের সুস্থতার জন্য আমাদেরকে অবশ্যই খাবারের তালিকার দিকে নজর দিতে হবে। চোখ ভালো রাখতে আমাদের প্রয়োজন ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, ভিটামিন ই, কপার ও ওমেগা ৩ফ্যাটি অ্যাসিড। এই ভিটামিন গুলো পাওয়া যায় এমন কিছু খাবার হল ভিটামিন এ, ভিটামিন এ পাওয়া যায় এমন কিছু খাবারগুলো হলো গাজর, মিষ্টি আলু, পালংশাক ও পেঁয়াজের কলি। দৃষ্টিশক্তি বজায় রাখতে, বিশেষ করে রাতের ‍দৃষ্টিশক্তি বজায় রাখতে এই ভিটামিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই খাবারের তালিকায় এ ধরনের খাবার নিয়মিত রাখা ভালো। ভিটামিন ‍সি, ভিটামিন সি এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট চোখকে অক্সিডেটিভ ড্যামেজ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। টকজাতীয় ফল, টমেটো ও বেরি ভিটামিন সি এর চমৎকার উৎস। তাই আমাদের প্রতিদিনের খাবারে ভিটামিন সি যুক্ত করা উচিত। এটি চোখ ভালো রাখে এবং এর আরও অনেক উপকারিতা আছে।ভিটামিন ই, বাদাম, বীজ এবং উদ্ভিজ্জ তেলে পাওয়া ভিটামিন ই ফ্রি র‌্যাডিক্যালের গঠন প্রতিরোধে সাহায্য করে। ফ্রি র‌্যাডিক্যাল চোখের ক্ষতি করতে পারে। তাই ভিটামিন ই যুক্ত খাবার নিয়মিত খেতে হবে। এতে চোখ ভালো রাখা সহজ হবে। কপার, এই খনিজটি চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য অপরিহার্য। কপার পাওয়া যায় ঝিনুক, মাংস ইত্যাদিতে। ওমেগা ৩ফ্যাটি অ্যাসিড, এই স্বাস্থ্যকর চর্বি ফ্যাটি মাছ যেমন, স্যমন, ম্যাকেরেল, ইলিশ  এবং টুনাতে পাওয়া যায়। এগুলো মস্তিষ্ক এবং চোখের স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। এছাড়াও সুষম খাদ্য খান, ফল, শাকসবজি, গোটা শস্য, চর্বিহীন প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি সমৃদ্ধ খাবার চোখের স্বাস্থ্য সহ সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। তাই নিয়মিত সুষম খাবার খেতে হবে। এতে চোখের পাশাপাশি শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত হবে। 

প্রতিদিনের সুষম খাবার

প্রতিদিনের খাবারে শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার রাখা উচিত। সুস্থ থাকতে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় সব ধরনের পুষ্টি উপাদান সুষমভাবে থাকা জরুরি। প্রতিদিনের খাবারে শস্যজাত খাবার থাকা উচিত, যেমন পরিমিত ভাত, ওটস, বা চিড়া। এগুলো শরীরের প্রধান শক্তির উৎস এবং সারাদিনের কাজ করার শক্তি যোগায়। প্রোটিনজাত খাবার প্রতিদিন দরকার। ডাল, ডিম,মাছ, মুরগি, দুধ বা দই পেশি গঠন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। শরীর সুস্থ রাখতে সবুজ শাকসবজি ও রঙিন সবজি খুব গুরুত্বপূর্ণ। পালংশাক, লালশাক, গাজর, টমেটো, লাউ, কুমড়া ইত্যাদি ভিটামিন, মিনারেল আঁশের ভালো উৎস, যা হজম ঠিক রাখে ও নানা রোগ থেকে রক্ষা করে। প্রতিদিন মৌসুমি ফল খাওয়া উচিত কলা, আপেল, কমলা, পেঁপে ও পেয়ারা ইত্যাদি শরীরকে সতেজ রাখে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। পরিমিত পরিমাণে ভালো চর্বি দরকার, যেমন সরিষার তেল, অলিভ অয়েল, বাদাম, তিল ও বীজজাত খাবার। এগুলো হৃদযন্ত্র ভালো রাখে। পাশাপাশি প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি ৮ থেকে ১০ গ্লাস পান করা জরুরি, কারণ পানি শরীরের সব কার্যক্রম সচল রাখে। অতিরিক্ত চিনি, লবণ. তেল, ফাস্টফুড ও প্রসেসড খাবার যতটা সম্ভব কমাতে হবে। নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার রাখতে হবে। সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পুষ্টিকর খাবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পুষ্টিকর খাবারের মধ্যে রয়েছে উচ্চ ফাইবার, কম চর্বিযুক্ত এবং উদ্ভিদ ভিত্তিক খাবার। নিয়মিত সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখলে শরীর সুস্থ, কর্মক্ষম ও রোগমুক্ত থাকে। তাই নিয়মিত সুষম খাবার খেতে হবে। 

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সুষম খাবার

আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হলো সংক্রমণ এবং অসুস্থতার বিরুদ্ধে আমাদের শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সুষম খাবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের খাবার দাবার একটি শক্তিশালী এবং প্রতিক্রিয়াশীল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কার্যকরভাবে কাজ করার জন্য ভিটামিন, খনিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং স্বাস্থ্যকর চর্বির ক্রমাগত সরবরাহের উপর নির্ভর করে। ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি, জিঙ্ক এবং প্রোবায়োটিকের মতো পুষ্টি উপাদানগুলি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কোষ তৈরি এবং বজায় রাখার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিছু খাবার শ্বেত রক্তকণিকার উৎপাদন বাড়ায়, প্রদাহ কমায় এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্যকে সমর্থন করে, যা শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য অপরিহার্য । এমন কিছু খাবার  হল টকজাতীয় ফল কমলালেবু , লেবু, আঙুর, মাল্টা, জাম্বুরা, পেয়ারা, আমলকি, স্ট্রবেরি, আনারস এবং পেঁপে ফল ভিটামিন সি সমৃদ্ধ, যা শ্বেত রক্তকণিকার উৎপাদন বৃদ্ধি করে, যা আমাদের শরীরের সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রথম সারির। রসুনে অ্যালিসিন থাকে, যা সালফারযুক্ত একটি যৌগ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং সর্দি ও কাশির তীর্বতা কমাতে সাহায্য করে। আদাতে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এটি কণ্ঠনালীর ক্ষত এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর সাথে বমি বমি ভাব কমাতে পারে। বাদাম, সূর্যমুখী বীজ এতে রয়েছে ভিটামিন ই একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা রোগ প্রতিরোধক কোষগুলিকে কার্যকরভাবে কাজ করতে সাহায্য করে। হলুদে কারকিউমিন নামে একটি সক্রিয় যৌগ রয়েছে এবং এটি প্রদাহ বিরোধী  ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিকারী প্রভাবের জন্য পরিচিত।  গ্রিন টিতে ক্যাটেচিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। 

কোলাজেন উৎপাদনে পুষ্টিকর খাবারের ভূমিকা

কোলাজেন হচ্ছে এক ধরণের প্রোটিন, এটি আমাদের স্কিনের ভেতরে থাকে। এগুলো স্কিনের ভেতরে থেকে আমাদের স্কিনকে মসৃণ এবং টানটান কর। কোলাজেন ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে সাহায্য করে । বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে শরীরে কোলাজেনের পরিমাণ কমতে থাকে। ফলে আমাদের ত্বকের চামড়া ঢিলে হতে শুরু করে দেয়, যা বয়সকে বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু  কিছু কিছু খাবার প্রাকৃতিক উপায়ে কোলাজেন উৎপাদন করতে পারে। কোলাজেন সমৃদ্ধ খাবার বয়স বাড়ার এ প্রক্রিয়াকে ধীর গতির করে দেবে। কিছু কোলাজেন সমৃদ্ধ খাবার হলো হাড়ের ঝোল, মুরগি বা গরুর মতো প্রাণীর হাড় এবং সংযোগকারী কলা অল্প আঁচে ফুটিয়ে বোন ব্রথ তৈরি করা হয়। এটি কোলাজেনে ভরপুর অ্যামিনো অ্যাসিড এবং খনিজ পদার্থ, যা ত্বককে মেরামত ও স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি ত্বকের হাইড্রেশন এবং দৃঢ়ত বাড়ায়। ডিম, ডিমের সাদা অংশে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন  থাকে এবং কুসুমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি থাকে, যা শরীরে কোলাজেন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড সরবরাহ করে। যদিও ডিমে সরাসরি কোলাজেন থাকে না, তবে এর পুষ্টি উপাদান শরীরের স্বাভাবিক কোলাজেন উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে। সামুদ্রিক কোলাজেল, ঝিনুক, মাছ, স্যামন, চিংড়ি, টুনা ও ম্যাকরল বিশেষ করে এর চামড়ায় থাকে সামুদ্রিক কোলাজেন যা দ্রুত শোষিত হয় বলে জানা যায়। এটি মসৃণ এবং দৃঢ় ত্বকের প্রচার করে। ওমেগা ৩ফ্যাটি সমৃদ্ধ যা প্রদাহ কমায় এবং শুষ্কতা কমায়। সাইট্রাস ফল, সাইট্রাস ফল হলো টকজাতীয় ফল, এর মধ্যে রয়েছে ভিটামিন সি। আর ভিটামিন সি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোলাজেল। এটি ছাড়া আমাদের শরীর সঠিকভাবে কোলাজেল তৈরি করতে পারে না। এটি ত্বকের বার্ধক্য রোধ করে। পাতাযুক্ত সবুজ শাকসবজি, পালংশাক ও ব্রকলির মতো সবুজ শাকসবজি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ভিটামিনে ভরপুর, যা ত্বককে সুরক্ষা দেয় এবং এর বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। বেরি, স্টবেরি, ব্লুবেরি, এবং রাম্পবেরির মতো বেরি জাতীয় ফল ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর যা সহায়তা করে কোলাজেন উৎপাদনে। বাদাম ও বীজ, বাদাম, আখরোট, তিসির বীজ, এবং চিয়া বীজে জিঙ্ক, ভিটামিন ই এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি থাকে, যা কোলাজেন রক্ষা করে।

ত্বকের যত্নে যেসব খাবার এড়িয়ে চলতে হবে

আমাদের শরীরের যত্নের জন্য খাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ  বিষয়। ত্বক ভালো রাখতে আমাদের কিছু কিছু খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। আমরা যতই নামী দামী ক্রিম, সাবান, পাউডার, লোশন, তেল ব্যবহার করি না কেন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস যদি চালাতে না পারি, তাহলে কিন্তু হাজার হাজার চেষ্টা করেও স্বাস্থ্যেজ্জ্বল ত্বক পাওয়া সম্ভব হবেনা। তাই ত্বকের যত্নের পাশাপাশি পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের খাবারের তালিকায়। ত্বকের যত্নের জন্য আমাদের যে খাবারগুলো এড়িয়ে চলা উচিত তা হলো লবণ, আমাদের শরীরে আয়োডিনের ঘাটতি পূরণ করে লবণ। তবে অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার কারণে মুখে বিশেষ করে, চোখের চারপাশে ফোলাভাব দেখা দেয়। আমাদের চোখের চারপাশের ত্বক অনেক পাতলা হয়। অতিরিক্ত সোডিয়াম বা লবণ গ্রহণে এসব জায়গা ফুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। চিনি, চিনি শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর একটি খাবার। চিনিতে প্রচুর ক্যালরি থাকায় এটি খেলে ওজন বেড়ে যায়। পাশাপাশি ত্বকেও খারাপ প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার অভ্যাস ত্বকে ইনফ্লামেশন তৈরি করে, যা থেকে একনে ব্রেকআউট দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি যাদের পিসিওএসের তো হরমোনাল সমস্যার কারণে একনে হয়, তাদের একনেও অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার ফলে বেড়ে যেতে পারে। চকলেট, কম বেশি সবাই চকলেট খেতে পছন্দ করেন। তবে আমাদের ত্বক সুস্থ রাখার জন্য যে খাবারগুলো এড়িয়ে চলতে হবে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চকলেট। কারণ যদি আপনি নিয়মিত চকলেট খান, তাহলে আপনার শরীরে প্রক্রিয়াজাত চিনির পরিমাণ বেড়ে যাবে মারাত্মক আকারে। এই অতিরিক্ত চিনির কারণে ত্বকে থাকা কোলাজেনের ব্যালেন্স নষ্ট হয়, যা ত্বকের ইলাস্টিসিটি নষ্ট করে। ত্বকের ন্যাচারাল গ্লো হারিয়ে ত্বক হয়ে যায় মলিন। কোমল পানীয়, খুব গরম পড়লে কোমল পানি পান করা প্রায় সবারই একটি নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কোমল পানীয় পান করতে বেশ ভালো লাগলেও ত্বকের জন্য কিন্তু এটি মোটেও ভালো না। কারণ এগুলোতে রয়েছে উচ্চ মাত্রায় চিনি। ফাস্টফুড ও তেলে ভাজা খাবার, আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন বিকেলের নাস্তায় সিঙাড়া, চমোচা, চপ বা বার্গার ইত্যাদি খাওয়ার অভ্যাস আছে। এসব খাবার খেতে ভালো লাগলেও, ত্বকের জন্য কিন্তু এগুলো একেবারেই উপযোগী নয়। এই খাবার গুলা আমাদের শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। কফি, আমরা ক্লান্তি দূর করতে কফি খাই অনেকেই, আবার কেউ কেউ কফি না খেলে দিনই শুরু হয়না, তবে এই অতিরিক্ত কফি পান করার ফলে শরীরে দেখা দিতে পারে ডিহাইড্রেশন এবং সেই সাথে ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা। প্রক্রিয়াজাত খাবার, যে সকল খাবার প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত না হয়ে বিভিন্ন শিল্প কারখানায় নানা প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত হয়, সেসব খাবার ত্বকের জন্য বেশ ক্ষতিকর। এসব খাবার যেমন চিকেন নাগেটস, মিটবল, ক্যানে থাকা ফল বা সবজি, জুস, চিপস অন্যতম। এ সকল খাবার আমাদের স্কিনের জন্য খুবই ক্ষতিকর। 

ত্বকের উজ্জ্বলতা ও তারুণ্য ধরে রাখতে শুধু মাত্র বাইরের প্রসাধনী ব্যবহার যথেষ্ট নয়, ভেতর থেকে পুষ্টি যোগানো জরুরি, এর জন্য প্রয়োজন সুষম খাবারের। আমাদেরকে সুষম খাবারের প্রতি নজর দিতে হবে। সুষম খাবার দেহের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহ করে, যা কোলাজেন তৈরি, কোষের ক্ষতি রোধ এবং ত্বকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আনতে সরাসরি সাহায্য করে। সুষম খাবার ত্বক, চুল, নখকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল ও স্বাস্থ্যকর চর্বি ত্বকের কোষ ঠিক রাখতে সাহায্য করে। ভেতর থেকে রূপচর্চার জন্য পর্যপ্ত পানি পান করাও জরুরি, কারণ পানি ত্বক হাইড্রেটেড রাখে। ফল, শাকসবজি, ডাল, মাছ, ডিম ও বাদাম নিয়মিত খেলে স্বাভাবিকভাবেই ত্বকে গ্লো আসে।  তাই রূপচর্চায় ভালো ফল পেতে চাইলে সুষম খাবারকে প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত করা দরকার। সুষম খাবারে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বকের কোষকে অকালে বুড়িয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। শাকসবজি ও ফলমূল খেলে কোলাজেন উৎপাদন বাড়ে, যা ত্বককে টানটান রাখে এবং বলিরেখা দূর করে। পরিশেষে বলা যায়, বাহ্যিক রূপচর্চা সাময়িক সৌন্দর্য দিলেও, আসল ও স্থায়ী সৌন্দর্যের মূল চাবিকাঠি হলো সুষম খাদ্যাভ্যাস। সুষম খাদ্যাভ্যাস শুধু ত্বকের সৌন্দর্যই নয়, বরং এটি দৈহিক সুস্থতা বজায় রাখে। আর শরীর সুস্থ থাকলে মন ভালো এবং মন ভালো থাকলে শরীরের ত্বক ও ভালো থাকে। কারণ আমরা যা খাই যা চিন্তা করি তার প্রতিফলনই ফুটে ওঠে আমাদের চেহারায়।  
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url