শিশুর শারীরিক এবং মানসিক বিকাশে পুষ্টিকর খাবার ও তার গুরুত্ব।

প্রত্যেকটি শিশু বেড়ে ওঠার জন্য পুষ্টিকর খাবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি, শারীরিক বিকাশ এবং মানসিক উন্নতির জন্য পুষ্টিকর খাবারের কোনো বিকল্প নেই। প্রত্যেকটা শিশুই আমাদের কাছে সেরা। আমাদের যার যার শিশু, তার কাছে সেরা হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমরা কখনোই চাইব না আমার শিশুকে অন্যজনের সাথে তুলনা করার জন্য। অন্যের সন্তানের ওজন বেশি, আর আমার সন্তানের ওজন কম, ও খুব ভালো খাচ্ছে আর আমার বাচ্চা খাচ্ছে না। এসব তুলনা বা কম্পেয়ারগুলো  আমাদের পিতা-মাতার মধ্যে থাকে। যার কারণে বাবা মার মনে একটা চিন্তা থাকে। তেমনি এই চিন্তাটা কিন্তু অটোমেটিকভাবে আপনার শিশুর ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই শিশুদেরকে সেরা করে গড়ে তুলতে হলে পুষ্টিকর খাবারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। জন্মের পর থেকেই প্রত্যেকটি শিশুর শরীরে দূত পরিবর্তন ঘটে। আর এই সময়ে শিশুকে সঠিক ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। শিশুদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় প্রয়োজনীয় সকল পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ খাবার রাখা উচিত। শিশুদের জন্য সবচেয়ে ভালো ও পুষ্টিকর খাবার হচ্ছে ডিম, দুধ ও কলা। এগুলো শিশুদের শরীরে সুপার ফুড হিসেবে কাজ করে। তাই অন্যান্য খাবারের সাথে এই খাবারগুলো শিশুদের জন্য নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখার চেষ্টা করবেন। ডিমের মধ্যে বিভিন্ন রকমের ভিটামিন, ক্যালসিয়াম এবং প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট আছে। এটি মুরগির ডিম, কোয়েলের ডিম বা হাঁসের ডিম হতে পারে। অনেকেরই হাঁসের ডিমে অ্যালার্জি থাকে। তবে যদি আপনার শিশুর হাঁসের ডিমে কোনো রকম এ্যালার্জি না থাকে, তাহলে সপ্তাহে ৫-৭ দিন খাওয়াতে পারেন। একটা ডিম শিশুকে ৪-৫ ঘন্টা পর্যন্ত তৃপ্ত রাখতে সাহায্য করে। ডিমে থাকা ক্যালসিয়াম শিশুদের হাড় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া ডিমের সাদা অংশে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন আছে।

 শিশুদের ভালো ও সুস্থ রাখতে তাদেরকে প্রতিদিন দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। শিশুর জন্মের পর প্রথম এক হাজার দিনকে বিশেষ গুরুত্ব দিন। এ সময় কোনোভাবেই যেন তার দুধের ঘাটতি না হয়। জন্মের পর শিশুকে মায়ের বুকের দুধ দেওয়া সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। দুধ এবং দুধ জাতীয় খাবার, যেমন পনির, চিজ, দই, ঘি, মাখন  ছোট বেলা থেকেই শিশুর খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করুন। দুধে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন থাকে। আর আমরা জানি প্রোটিন এবং আমিষ শিশুদের লম্বা হতে সাহায্য করে এবং শরীরের বৃদ্ধি ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশুর আরেকটি অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবার হলো কলা। কলায় বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, মিনারেল, পুষ্টি উপাদান এবং ফাইবার আছে। অর্থাৎ, শিশুর শরীরের সুগঠন ও বিকাশের জন্য কলা অত্যান্ত জরুরি। তাই এই তিনটি খাবার দুধ, ডিম ও কলা নিয়মিত শিশুর খাদ্যতালিকায় রাখার চেষ্টা করুন। দুধ, ডিম এবং কলা এই খাবারগুলো যেন ফিক্সড থাকে শিশুর জন্য। আপনার শিশুকে সুস্থ স্বাভাবিক ও মেধাবী করে বড় করতে চাইলে বাধ্যতামূলকভাবে আপনি পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে। এছাড়া আপনি অন্যান্য পুষ্টিকরকর খাবার ও খাওয়াতে পারেন। শিশুদের জন্য বিভিন্ন ধরনের বাদাম রাখতে পারেন। বাদাম শিশুর ব্রেইন গঠনে সাহায্য করে। তাছাড়া ড্রাই ফুডস যেমন কিশমিশ, খেজুর, আমসত্ত্ব ও এপ্রিকট এই খাবারগুলো মাঝে মাঝে রাখার চেষ্টা করবেন। এটা সপ্তাহে ১ দিন হলেও হবে। এগুলো শিশুর জন্য আসলে সুপার ফুড। এই খাবারগুলো বাচ্চার শরীরে খুব ভালো কাজ করবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে এবং শিশুকে অল্প খাবারে অনেক বেশি ক্যালরি এবং নিউট্রিশন দেবে।   

শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও বিকাশে পুুষ্টিকর খাবার

প্রত্যেকটি শিশুকে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পুষ্টিকর খাবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুষ্টিকর খাবার শিশুর শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও বিকাশে পুষ্টিকর খাবারের বিকল্প নেই। পুষ্টিকর খাবার শিশুর শরীরের শারীরিক বৃদ্ধি, বিকাশ, হাড় ও দাঁতের গঠন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। শিশুদের জন্য প্রধান পুষ্টিকর খাবারের মধ্যে রয়েছে ডিম, দুধ, কলা,  ‍দুদ্ধজাত খাবার, সবুজ শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, মাংস ও ডাল। শিশুদের নিয়মিত এই খাবারগুলো খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন। শিশুর প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে রাখা খুবই প্রয়োজন

 শিশুর পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব

শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রত্যেকটা শিশুকে সুস্থ, সুন্দর ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অনেক। শিশুদের ছোটকাল বা শৈশবকাল হলো শরীর ও মস্তিষ্কের দ্রুত বৃদ্ধি ও বিকাশের সময়। তাই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো উচিত। শিশুদের সেরা করে গড়ে তুলতে হলে তাদের পুষ্টিকর খাবারের প্রতি উৎসাহিত করতে হবে। শিশুর শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়ানো অত্যন্ত জরুরি। পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টি শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, মানসিক বিকাশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পুষ্টিকর খাবারে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন এবং খনিজ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকে। ছোটবেলা থেকেই শিশুর খাবারের প্রতি যত্নশীল হয়ে পুষ্টিকর ও সুষম খাবার নিশ্চিত করা প্রত্যেক পিতা ও মাতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ডিম, দুধ, কলা, মাছ, মাংস, ডাল, শাকসবজি, ফলমূল ও বিভিন্ন ধরনের শস্য শিশুর খাবার তালিকায় রাখা উচিত। এসব খাবার শিশুর হাড় ও দাঁত মজবুত করতে, পেশির বৃদ্ধি ঘটাতে এবং শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তি যোগাতে সহায়তা করে। পুষ্টিকর খাবার শিশুর মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও শেখার সক্ষমতা বিকাশে সহায়তা করতে পারে। এছাড়া পুষ্টিকর খাবার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখতে সাহায্য করে। প্রত্যেকটি শিশুর সুস্থ, স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার জন্য এবং সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পুষ্টিকর খাবারের প্রতি মনোযোগী করে গড়ে তোলা উচিত।

দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে পুষ্টিকর খাবার

শিশুর দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে পুষ্টিকর খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে আমরা দেখতে পাই, ছোট বয়স থেকেই অনেক  শিশুরা চোখের সমস্যায় ভোগে। শিশুদের এই চোখের সমস্যা দূর করতে তাদের পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর বিকল্প নেই। শিশুদের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত খাবার, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ সাইট্রাস ফল, পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসবজি, বিভিন্ন ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়াতে হবে। শিশুদের দৃষ্টিশক্তি যাতে ভালো থাকে, এজন্য ছোটবেলা থেকেই তাদেরকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর দিকে নজর রাখতে হবে। শিশুদের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে তাদেরকে মাছ, ডিম, শাকসবজি, সাইট্রাস ফল, ড্রাই ফুটস পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়াতে হবে। অর্থাৎ শিশুদের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অসীম। 


দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে শিশুকে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত খাবার খাওয়ান। আর মাছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি বিদ্যমান। এটি খেলে শিশুর চোখ খুব ভালো থাকে। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ সাইট্রাস ফল প্রতিদিন খাওয়া শিশুদের চোখের জন্য ভালো। এটি খেলে চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়ে। শিশুর চোখের জ্যোতি বাড়াতে প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি খাওয়ান। কারণ শাকসবজিতে লুটেইনের মতো পুষ্টিগুণ থাকে। যা শিশুর চোখকে ভালো রাখতে সাহায্য করে। শিশুকে প্রতিদিন ডিম খেতে দিন। ডিম খাওয়া শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। ডিমে থাকা ভিটামিন চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। এটি রোগ  প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ায়। 

শিশুর প্রয়োজনীয় প্রধান পুষ্টি উপাদান

শিশুদের সুস্থ বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রধান পুষ্টি উপাদান নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পুষ্টি উপাদান শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, জ্ঞানীয় বিকাশ এবং সামুগ্রিক সুস্থতাকে সমর্থন করে। শিশুদের জন্য কয়েকটি প্রধান পুষ্টি উপাদান অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো প্রোটিন, প্রোটিন শিশুদের প্রয়োজনীয় প্রধান পুষ্টিগুনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রোটিন হলো দেহের গঠনমূলক একক, যা কলাসমূহের বৃদ্ধি, মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অপরিহার্য। এটি শিশুর শরীরের বৃদ্ধি, পেশি ও টিস্যু গঠনে সাহায্য করে। প্রোটিন পাওয়া যায় এমন কিছু খাবার হলো বাদাম, বীজ, মাছ, ডিম, মাংস ইত্যাদি। ক্যালসিয়াম, শিশুদের জন্য ক্যালসিয়াম গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। শিশুদের হাড় মজবুত ও দাঁত গঠনের জন্য ক্যালসিয়াম অপরিহার্য। ক্যালসিয়াম পাওয়া যায় এমন কিছু খাদ্য হলো দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্য, পাতাযুক্ত সবুজ শাকসবজি এবং টোফু। প্রত্যেকটি শিশুকে সকালের নাস্তার সাথে দুধ খেতে উৎসাহিত করুন। এতে শিশুর ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ হবে। ভিটামিন এ, শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, দৃষ্টিশক্তি এবং ত্বকের স্বাস্থ্যের জন্য ভিটামিন এ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন এ পাওয়া যায় মিষ্টি আলু, পালংশাক, গাজর ইত্যাদিতে। ভিটামিন সি, কমলা, লেবু, স্ট্রবেরি, ক্যাপসিকাম, ব্রকলি ও টমেটো এগুলো হলো ভিটামিন সি জাতীয় খাবার। এটি আয়রন শোষণে সাহায্য করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। ভিটামিন ডি: এটি শরীরকে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে, যা হাড়ের বৃদ্ধি ও শক্তি বাড়ায়। ভিটামিন ডি পাওয়া যায়, সূর্যালোক, সামুদ্রিক মাছ, দুগ্ধজাত পণ্য ও ডিমের কুসুমে। আয়রন, রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরির জন্য আয়রন অপরিহার্য। আয়রনের অভাবে শিশুর অ্যানিমিয়া হতে পারে। শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশে আয়রন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জিংক, শিশুর বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ক্ষত সারাতে ভূমিকা রাখে। খাদ্যআঁশ, হজম শক্তি ভালো রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।

শিশুর ওজন বাড়াতে পুষ্টিকর খাবার

অনেক শিশুর বয়স অনুযায়ী ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকে। ওজন কম থাকার কারণে  শিশুদের শরীরে শক্তির অভাব দেখা দেয়, এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই শিশুর স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন বাড়াতে তাদেরকে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার দিতে হবে। শিশুদের ওজন বাড়াতে পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অসীম। কিছু কিছু পুষ্টিকর খাবার আছে, যা শিশুর ওজন বাড়াতে সাহায্য করে। যেমন দুধ, কলা, মাংস, ডিম, বিভিন্ন ধরনের বাদাম, মিষ্টি আলু ইত্যাদি। ছয় মাসের পর থেকেই শিশুকে কলা দেওয়া যায়। কলায় প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, পটাশিয়াম ও ভিটামিন রয়েছে। মিষ্টি আলুতে পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন রয়েছে, এটি দ্রুত শিশুর ওজন বৃদ্ধি করে। প্রোটিনের প্রধান উৎস ডিম। প্রতি ১০০ গ্রাম ডিমে প্রায় ১৪ গ্রাম প্রোটিন রয়েছে। প্রাকৃতিক প্রোটিন এবং কার্বোহাইড্রেটের প্রধান উৎস হচ্ছে দুধ। প্রোটিনের অন্যতম একটি উৎস হচ্ছে মাংস। এটি পেশি মজবুত করে শিশুর  ওজন বৃদ্ধি করে।  

প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের গুরুত্ব

শিশুর শরীরের জন্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের বৃদ্ধি, গঠন ও ক্ষয়পূরণে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রোটিন হলো শরীরের গঠন উপাদান। এগুলি অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরি যা পেশী বৃদ্ধি, টিস্যু মেরামত, হরমোন উৎপাদন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য প্রয়োজনীয়। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বিশেষ ভাবে প্রয়োজন। নিয়মিত পরিমাণমতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহন করলে, শিশুর পেশি ও হাড়ের গঠন শক্তিশালী হতে সাহায্য করে। শিশুরা সারাদিন প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খেলে রক্তে শর্করার পরিমাণ স্থিতিশীল থাকে এবং দীর্ঘস্থায়ী শক্তি পাওয়া যায়। এছাড়া প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে, ক্ষতস্থান দ্রুত সারাতে এবং শরীরে প্রয়োজনীয় হরমোন ও এনজাইম তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ  ভূমিকা রাখে। প্রোটিন পাওয়া যায় এমন কিছু খাবার হলো দুধ, ডিম, মাছ, মাংস, ডাল, ছোলা, বাদাম ও বিভিন্ন ধরনের বীজে। এই খাবারগুলো শিশুর শরীরের বিভিন্ন কোষ ও টিস্যু গঠনে সহায়তা করে। তাই বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিদিনের খাবার তালিকায় পরিমাণমতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা উচিত।  প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার শিশুদের সারাদিন ধরে টেকসই শক্তি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আপনি যদি আপনার শিশুকে একটি সুস্থ জীবন ধারা বজায় রাখতে চান, তাহলে আপনার শিশুর খাদ্য তালিকায় প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি এবং শক্তি অর্জনের মূল চাবিকাঠি। শিশুর শরীরের সুস্থ বৃদ্ধি, শারীরিক বিকাশ এবং মানসিক উন্নতির জন্য প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারের বিকল্প নেই।  

ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ খাবারের প্রয়োজনীয়তা

শিশুদের ক্ষেত্রে ভিটামিন ও খনিজ হলো এমন কিছু প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান, যা শিশুর শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, শক্তি উৎপাদন, মানসিক বিকাশ এবং রোগ প্রতিরোধের জন্য খুবই সামান্য পরিমাণে প্রয়োজন হয়। শিশুদের শরীরে ভিটামিন ও খনিজ নিজে নিজেই তৈরি হয় না। এগুলো পুষ্টিকর খাবার গ্রহনের  মাধ্যমে তৈরি হয়। ভিটামিন হলো (Vitamins) শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম ঠিকভাবে চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জৈব পুষ্টি উপাদান। যেমন ভিটামিন A, ভিটামিন B, ভিটামিন C, ভিটামিন D, ভিটামিন E, এবং ভিটামিন K। খনিজ হলো (Minerals) শরীরের বৃদ্ধি, হাড় ও দাঁতের গঠন, রক্ত তৈরি  এবং স্নায়ু ও পেশির কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় অজৈব পুষ্টি উপাদান। যেমন ক্যালসিয়াম, আয়রন, জিংক, ম্যাগনেশিয়াম ও পটাশিয়াম। এই ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ খাবার শিশুর শরীরের সুস্থতা ও স্বাভাবিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত। ১। চর্বি দ্রবণীয়, যেমন ভিটামিন এ, ডি, ই, এবং কে। ২। জল দ্রবণীয়, যেমন ভিটামিন সি এবং বি। চর্বি দ্রবণীয় ভিটামিন শরীরের ফ্যাটি টিস্যু এবং লিভারে জমা হয়, যেখানে জল দ্রবণীয় ভিটামিন জমা হয় না এবং প্রস্রাবের মাধ্যমে নির্গত হয়, যা নিয়মিত গ্রহণকে অপরিহার্য করে তোলে। অন্যদিকে, খনিজ পদার্থ দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত, ১। ম্যাক্রোমিনারেল (বৃহত্তম পরিমাণে প্রয়োজনীয়), ২। ট্রেস মিনারেল (কম পরিমাণে প্রয়োজনীয়)। ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ খাবার শরীরের সুস্থতা ও স্বাভাবিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, হাড় ও দাঁত শক্ত রাখা, রক্ত তৈরিতে সহায়তা, ত্বক ও চুলের সুস্থতা এবং চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি বজায় রাখতে ভিটামিন ও খনিজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশুদের ক্ষেত্রে ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ খাবার শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়। তাই শিশুদের খাবারের তালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, দুধ ও দুধ জাতীয় খাবার, ডিম, মাছ, মাংস, ডাল ও বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার রাখা উচিত।

শিশুদের জন্য উপকারী ফল ও সবজি

শিশুদের সুস্থ ভাবে বেড়ে ওঠার জন্য ফল ও সবজি খাওয়া অত্যন্ত উপকারী। শিশুদের সুস্থ বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শরীরের প্রয়োজনীয় সকল পুষ্টি ও ভিটামিন এবং খনিজের চাহিদা পূরণে ফল ও সবজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক শিশুই আছে যারা ফল ও সবজি খেতে পছন্দ করে না। এজন্য ফল ও সবজি শিশুদের সামনে আকর্ষণীয়ভাবে পরিবেশন করতে হবে। ফল ও সবজিতে আছে ভিটামিন, খনিজ লবণ, পানি ও ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট। শিশুদের সকাল ও বিকালের নাস্তায় হালকা খাবারের সাথে আস্ত ফল খেতে দিলে ভালো হয়। তাছাড়া সবজি ‍দিয়ে শিশুদের স্যুপ বানিয়ে দিতে পারেন। গাজর, টমেটো, মিষ্টি কুমড়া, মিষ্টি আলু, পেঁপে, মটরশুঁটি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি ইত্যাদি শিশুদেরকে কাচা বা স্যুপ বানিয়ে খাওয়ানো যায়। এছাড়া নুডলসের সঙ্গে বেশি করে সবজি দিয়ে আকর্ষণীয়ভাবে শিশুদের খাওয়ানো যায় এবং সবজি ‍দিয়ে চপ বানিয়ে ‍দিলেও ভালো হয়। শিশুদের খাবারে বিভিন্ন রঙের শাকসবজি রাখুন, এটি বাচ্চারা উৎসাহিত হয়ে খেতে পারবে। শিশুদের খাবারে ফলের মধ্যে কলা, আপেল, ডালিম, পেয়ারা, পেঁপে, আমও কমলা রাখার চেষ্টা করুন। কারণ এগুলো বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ  খাবার এবং পটাশিয়াম, ফাইবার ভিটামিন এ, ভিটামিন সি এর ভালো উৎস। শিশুদের জন্য উপকারী সবজিগুলোর মধ্যে রয়েছে গাজর, টমেটো, পালংশাক, মিষ্টি কুমড়া, ব্রোকলি, ফুলকপি ও লাউ। এই সবজিগুলো শিশুদের শরীরের জন্য খুব উপকারী। গাজরে রয়েছে ভিটামিন এ, টমেটো ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ভালো উৎস। পালংশাকে রয়েছে আয়রন ও ফোলেট, ফুলকপি ও মিষ্টি কুমড়ায় রয়েছে ফাইবার ও বিভিন্ন ভিটামিন। এই সবগুলো শাকসবজি শিশুদের খাদ্য তালিকায় রাখলে শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা সহজ হবে। এই ফল ও সবজি শিশুদের শরীরের জন্য খুব উপকারী।

দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের ভূমিকা

দুধ শিশুর বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য পুষ্টিকর খাদ্য সমূহের অন্যতম। দুধ হলো স্ত্রী স্তন্যপায়ী প্রাণীদের স্তন্যপায়ী গ্রন্থি দ্বারা নিঃসৃত তরল, যা জন্মের পরপরই শুরু হওয়া সময়ের জন্য তাদের বাচ্চাদের পুষ্টি দেয়। গৃহপালিত পশুর দুধ মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যের উৎস।  শিশুদের জন্য দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, হাড় ও দাঁতের গঠন এবং সুস্থ বিকাশে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার অপরিহার্য়। দুধে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টি উপাদান রয়েছে। দুধে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যায়। দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার যেমন দই, ছানা, পনির, মাখন, চিজ ও দুধ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন খাবার শিশুর খাদ্যতালিকায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুগ্ধজাত পণ্যের উচ্চমানের প্রোটিন শিশুদের জন্য খুবই উপকারী। ক্যাসিন একটি প্রোটিন যা শুধুমাত্র  ‍দুধে পাওয়া যায়। শিশুদের সম্পূর্ণ খাবার তালিকা সুষম রাখতে হলে দুধ অন্তর্ভুক্ত রাখা জরুরি। দুধ ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস, যা হাড় ও দাঁত মজবুত রাখে। দুধে রয়েছে ভিটামিন বি১২ ও ভিটামিন ডি, যা শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং হাড়ের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। দুধে পুষ্টি উপাদানের মধ্যে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস এবং পটাশিয়াম উল্লেখযোগ্য। দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার শিশুদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ, শরীরের বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধে একটি আদর্শ খাবার।

 ডিম, মাছ ও মাংসের পুষ্টিগুণ

ডিম, মাছ ও মাংসের পুষ্টিগুণ প্রচুর। শিশুদের শরীরের জন্য ডিম, মাছ ও মাংস খুবই উপকারী। শিশুদের সুস্থ, স্বাভাবিক ভাবে গড়ে তুলতে ডিম, মাছ ও মাংস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা  পালন করে। শিশুকে সেরা করে গড়ে তুলতে হলে এবং সেরা পুষ্টি দিতে হলে ডিম, মাছ ও মাংসের কোনো বিকল্প নেই। ডিম, মাছ ও মাংস শিশুদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিকর খাবার। ডিম, মাছ ও মাংসে প্রচুর পরিমাণে উচ্চমানের প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রয়েছে। প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ শিশুদের শরীরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রোটিন শরীরের বৃদ্ধি, পেশি ও কোষ গঠন এবং শিশুদের শরীরের ক্ষয় পূরণে সাহায্য করে। প্রোটিন শিশুদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিকর উপাদান। ভিটামিন হলো শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় এক ধরনের জৈব পুষ্টি উপাদান। ভিটামিন শিশুর শরীরের বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিভিন্ন কার্যক্রম সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। ডিমে প্রোটিনের পাশাপাশি ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি১২ এবং কোলিন ও আয়রন রয়েছে। মাছ থেকে শিশুরা প্রোটিন, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি১২ এবং বিভিন্ন খনিজ পেয়ে থাকে। খনিজ হলো এক ধরনের অজৈব পুষ্টি উপাদান, যা শিশুর শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশুদের জন্য মাংসও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাংসে প্রোটিনের পাশাপাশি আয়রন, জিংক ও ভিটামিন বি১২ পাওয়া যায়। যা শিশুর রক্তকণিকা তৈরি ও শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। ডিম, মাছ ও মাংসের পুষ্টিগুন অনেক। তাই শিশুদের খাদ্যতালিকায় ডিম, মাছ ও মাংস রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পুষ্টিকর খাবার

জন্মের পর একটি বাচ্চার প্রধান খাবার হলো তার মায়ের দুধ। শিশু যদি ছয় মাস পর্যন্ত মায়ের দুধ সঠিকভাবে পান করে, তবে  এটি তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মায়ের খাদ্য তালিকাও কিন্তু অনেক সমৃদ্ধ হতে হবে। কারণ মায়ের দুধের মাধ্যমে শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়। শিশুকে ছয় মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানে উচিত। মায়ের দুধ অনেক বেশি  রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে সাহায্য করবে। ছয় মাসের পর থেকে শিশুর খাদ্যতালিকায় ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর ও বিভিন্ন সুষম খাবার যোগ করতে হবে। বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি শিশুর জন্য উপকারি।  মিষ্টি কুমড়া, গাজর, টমেটো এগুলোকে সেদ্ধ করে হালকা মসলা ও তেল দিয়ে শিশুকে খেতে  দিন। যখন শিশু খাবার চিবিয়ে খেতে সক্ষম হয়, তখন শিশুকে একটি গাজরের স্টিক কেটে হাতে দেওয়া যেতে পারে। টমেটো কাঁচা খাওয়ানো যেতে পারে। এটি শিশুকে নিজে খাবার খেতে শেখাতে সাহায্য করে। টমেটো অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ, যা শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে। তাছাড়া, শিশুকে বিভিন্ন ধননের ফল খেতে উৎসাহিত করতে হবে। যেভাবেই হোক শিশুর খাদ্যতালিকায় একটি ফল যেন প্রতিদিন থাকে। অনেক মা আছেন, যারা শিশুকে ফলের জুস করে দেন। তবে এর চেয়ে বেশি উপকার হলো শিশুকে বয়স অনুযায়ী পুষ্টিকর ফল সরাসরি খেতে দেওয়া। ছোটবেলা থেকেই কলা ও আপেল দিয়ে শুরু করতে পারেন। কলা ও আপেল দুটি ফলই কিন্তু শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। শিশুর খাদ্যতালিকায় ডিম ও বাদামসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার যোগ করতে হবে। চেষ্টা করতে হবে শিশুর খাদ্যতালিকায় যেন ভালো পরিমাণে শাকসবজি ও মাছ থাকে। শাকসবজি কিন্তু তাকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করবে। বিভিন্ন রঙের ফল ও সবজি এবং ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ খাবারের সমন্বয়ে শিশুর সুষম খাদ্যতালিকা তৈরি করা উচিত। এতে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং শিশু সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠবে।

সুষম খাদ্যভ্যাস গড়ে তোলার উপায়

শিশুদের ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পুষ্টিকর খাবারের কোনো বিকল্প নেই। শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কয়েকটি উপায় দেওয়া হলো নিজেই হোন শিশুর আদর্শ, শিশুরা বড়দের দেখে দেখে শিখে। শিশুরা সবসময় বড়দের অনুসনণ করে। তাই শিশুর মধ্যে সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হলে আগে আপনি নিজে এবং পরিবারের সকল সদস্যরা অভ্যাস মেনে চলুন। পরিবারের সবাই শিশুদেরকে নিয়ে একসাথে বসে নিয়মিত ফলমূল, শাকসবজি, দুধ, ডিম, দই, বাদার খান, তাহলে শিশুও স্বাভাবিকভাবে সেগুলোর প্রতি উৎসাহিত হবে।আকর্ষণীয় প্লেট তৈরি করুন, শিশুরা খাবার খাওয়ার চেয়ে খাবারের প্লেটের দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়। খাবারকে দৃশ্যত আকর্ষণীয় এবং উত্তেজনাপূর্ণ করতে তাদের প্লেটে ফল ও সবজির একটি রংধনু অন্তর্ভুক্ত করুন। পছন্দকে সম্মান করুন, শিশুকে খাবার খাওয়ানোর সময় তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা ও তাদের পছন্দগুলিও স্বীকার করুন। খাবার খাওয়াতে বিভিন্ন উৎসাহ দিন শিশুকে। সারাদিন জল খাওয়ার জন্য উৎসাহ দিন। ধৈর্য ধারণ করুন, নতুন খাবার যোগ করাতে শিশু না ও খেতে পারে। এতে ধৈর্য হারাবেন না। একটি নতুন খাবার গ্রহণ করার জন্য শিশুর বেশ কিছু প্রচেষ্টা লাগতে পারে। তারা প্রাথমিকভাবে প্রত্যাখ্যান করলে চালিয়ে যান। কোনো রকম চাপ ছাড়াই অফার করতে থাকুন। চাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন, শিশুকে জোর করে খাওয়ানো বা চাপ ‍দিয়ে খাওয়ানো মোটেই উচিত নয়, এতে বিপরীতমুখী হতে পারে। খাবারের সময়কে আনন্দময় করুন, শিশুর খাবার খাওয়ার পরিবেশ যেন হয় আনন্দময়। চাপ, শাসন, বকাঝকা বা তর্ক-বিতর্কের মধ্যে খাওয়ালে খাবারের সাথে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে পারে। বরং পরিবারের সবাই মিলে একসাথে খেতে পারেন, গল্প করতে করতে, হাসিখুশি পরিবেশে একসাথে খেলে শিশুরা খাবারকে ইতিবাচক হিসেবে নেবে। খাবারে বৈচিত্র্য রাখুন, একই ধরনের খাবার বারবার না দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খাবার পরিবেশন করুন। সব ধরনের পুষ্টিকর খাবারই যেন শিশুর খাদ্যতালিকায় থাকে। বিভিন্ন রঙের ফল ও সবজি খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া, সময় মেনে খাবার খাওয়া শিশুদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে শিশুরা কখন খেতে হবে তা বুঝতে শেখে।

বয়স অনুযায়ী শিশুর খাদ্য নির্বাচন

শিশুর বয়স অনুযায়ী খাদ্য নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে শিশুর খাবারের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে। জন্ম থেকে শুরু করে প্রতি পর্যায়ে শিশুদের খাবার চাহিদা পরিবর্তন হতে থাকে। তাই বয়স অনুযায়ী শিশুর খাদ্য নির্বাচন করা উচিত। ০-৬ মাস, জন্ম থেকে প্রথম ছয় মাস শিশুর জন্য শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধই যথেষ্ট। যে বাচ্চারা পর্যাপ্ত পরিমাণে মায়ের বুকের দুধ পায়, তারা সব ধরনের পুষ্টিই মায়ের দুধ থেকে পেয়ে যায়। তাদের বাড়তি কোনো খাবারের প্রয়োজন হয় না। আর যে বাচ্চাকে মা বুকের দুধ দিতে পারেন না, তবে সে ক্ষেত্রে ফর্মুলা দুধ দিতে হবে। ৬-১২ মাস, এই সময়টা শিশুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছয় থেকে বারো মাস এ সময়টা বাচ্চাদের বাড়ন্ত সময়। দুই বছর পর্যন্ত বাচ্চাকে মায়ের দুধ দেওয়া যাবে। তবে ছয় মাসের পর থেকে বাচ্চাকে বাড়তি খাবার দিয়ে অভ্যাস্ত করাতে হবে। বুকের দুধের পাশাপাশি নরম ও সহজে হজম হয় এ জাতীয় খাবার দিতে পারেন।  যেমন ভাত মিশ্রণ, খিচুড়ি, ডাল, ডিম ,ফলের পিওরি এবং নরম শাকসবজি দেওয়া যেতে পারে। ১২-২৪ মাস, এই সময়ে বাচ্চাকে ৫-৭ বার খেতে দিন। নিয়ম করে খাওয়ান, যাতে শিশু ক্ষুধা বুঝতে শিখে। বিভিন্ন ধরনের রঙীন শাক সবজি ও ফলমূল খেতে দিন। মাছ, মাংস, ডিম, সবজি ও অন্যান্য খাবারগুলোতে শিশুকে ধীরৈ ধীরে অভ্যাস্ত করাতে থাকুন। ছোটবেলা থেকেই শিশুর খাবারের পুষ্টিগুণের দিকে নজর রাখুন। শিশুদের প্রতিদিন ডিম ও কলা খেতে দিন। ২ বছর বা তার বেশি পরিবারের সবাই যা খায় তা সবই অল্প অল্প করে খাওয়াতে পারেন। পরিবারের সুষম খাবারের পাশাপাশি দিনে তিন বার মূল খাবার ও সকাল বিকাল পুষ্টিকর হালকা নাশতা রাখা উচিত। এ সময় অবশ্যই শিশুকে ডিম, দুধ ও কলা খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। কারণ এগুলো প্রচুর পরিমানে প্রোটিন, পুষ্টি ও ভিটামিন রয়েছে। এতে অল্প খাবারে বেশি পুষ্টি পাওয়া যায়। এ সময় থেকে শিশুকে সকল প্রকার গাঢ় হলুদ ও সবুজ শাক-সবজি বেশি দিবেন। মুরগির বা গরুর কলিজা সপ্তাহে ২-৩ দিন খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন। দুধের সাথে বিভিন্ন ধরনের বাদাম মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করাবেন।

অস্বাস্থ্যকর খাবার থেকে দূরে রাখা 

জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে পুষ্টির গুরুত্ব অপরিসীম। শিশুদের সুস্থ বিকাশ, শারীরিক ও মানসিক উন্নতি এবং পুষ্টির ঘাটতি রোধ করতে তাদের অস্বাস্থ্যকর খাবার থেকে দূরে রাখতে হবে। তবেই তারা পুষ্টিকর খাবারের প্রতি মনোযোগ দিতে পারবে। অস্বাস্থ্যকর খাবার শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে, শিশুর দাঁতের ক্ষয় এবং বিভিন্ন সমস্যার কারণ হতে পারে এবং পুষ্টিকর খাবারের প্রতি শিশুর আগ্রহ কমে যেতে পারে, শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্লো করে দিতে পারে। তাই শিশুদেরকে অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ানো থেকে দূরে রাখতে হবে। অস্বাস্থ্যকর খাবার শিশুর শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। কারণ এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার শিশুদের স্থূলকায় করে তোলে এবং নানা রোগের কারণ হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) স্থূল জন্মহার, স্থূল মৃত্যুহার ও জনসংখ্যার তথ্য বলছে, দেশে ছয় মাস থেকে দুই বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৪৭ লাখ, কিন্তু রিপোর্টের জরিপের হার বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, ২৩ লাখের বেশি শিশু অস্বাস্থ্যকর খাবার খাচ্ছে, যা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ চিত্র। শিশুদের চকলেট, ফাস্টফুড, চিপস, কোমল পানীয়, আদা প্রস্তুত করা নুডলস, অতিরিক্ত চিনি জাতীয় ও লবণ জাতীয় খাবার থেকে দূরে রাখতে হবে। কোমল পানীয়তে প্রচুর পরিমাণে চিনি ও সংরক্ষক থাকে এবং নানা ধরনের ক্ষতিকর উপাদান থাকে, যা শিশুর অস্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। অতিরিক্ত লবণে ভরা খাবার শিশুর শরীরে ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। অতিরিক্ত লবণ শিশুর উচ্চরক্তচাপের কারণ হতে পারে। শিশু অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে পেট ভরে ফেললে, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করে না। এতে শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য ও ভিটামিনের ঘাটতি হয়। তাই শিশুদের এসব খাবার থেকে দূরে রাখতে পিতামাতাকে সচেতন হতে হবে।

জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুর একমাত্র পুষ্টিকর খাবার হলো মায়ের বুকের দুধ। পুষ্টিকর খাবার হলো, যে খাদ্য খেলে শিশুদের দেহ পুষ্ট হয় এবং বিভিন্ন রোগ আক্রমণের হাত থেকে শিশুর দেহকে রক্ষা করে তাকে পুষ্টিকর খাদ্য বলে। পুষ্টিকর খাদ্যে সব ধরনের ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, প্রোটিন, আয়রন, ফ্যাট, খনিজ লবণ ইত্যাদি সবই পাওয়া যায়। প্রোটিন হলো দেহের গঠনমূলক একক, যা কলাসমূহের বৃদ্ধি, মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অপরিহার্য। ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁত গঠনের জন্য অপরিহার্য।হিমোগ্লোবিন তৈরির জন্য আয়রন গুরুত্বপূর্ণ, যা রক্তে অক্সিজেন বহন করে। ভিটামিন এ শিশুর দৃষ্টিশক্তি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ত্বকের স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। ভিটামিন বি শিশুর শরীরে শক্তি উৎপাদন, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা এবং লোহিত রক্তকণিকা গঠনের জন্য অপরিহার্য। ভিটামিন সি টিস্যুর বৃদ্ধি ও মেরামতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভিটামিন ডি শরীরকে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে, যা হাড়ের বৃদ্ধি ও শক্তি বাড়ায়। তাই শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অসীম। শিশুর বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী ভাত, মাছ, ডাল, ডিম, দুধ, মাংস, বিভিন্ন রঙের শাক সবজি ও ফলমূলসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত। এগুলো শিশুর স্বাস্থ্যকর খাবার। পাশাপাশি শিশুকে অস্বাস্থ্যকর খাবার থেকে দূরে রাখতে হবে। অতিরিক্ত লবণ ও চিনি যুক্ত খাবার শিশুর শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাবার যেমন চিপস, বিস্কুট, চকলেট এবং ফাস্টফুড ইত্যাদি শিশুর শরীরের জন্য ক্ষতিকর। শিশুকে ছোটবেলা থেকেই সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করুন। শিশুর পিতা-মাতার উচিত তাদের দৈনন্দিন খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url