শিশুর শারীরিক এবং মানসিক বিকাশে পুষ্টিকর খাবার ও তার গুরুত্ব।
প্রত্যেকটি শিশু বেড়ে ওঠার জন্য পুষ্টিকর খাবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি, শারীরিক বিকাশ এবং মানসিক উন্নতির জন্য পুষ্টিকর খাবারের কোনো বিকল্প নেই। প্রত্যেকটা শিশুই আমাদের কাছে সেরা। আমাদের যার যার শিশু, তার কাছে সেরা হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমরা কখনোই চাইব না আমার শিশুকে অন্যজনের সাথে তুলনা করার জন্য। অন্যের সন্তানের ওজন বেশি, আর আমার সন্তানের ওজন কম, ও খুব ভালো খাচ্ছে আর আমার বাচ্চা খাচ্ছে না। এসব তুলনা বা কম্পেয়ারগুলো আমাদের পিতা-মাতার মধ্যে থাকে। যার কারণে বাবা মার মনে একটা চিন্তা থাকে। তেমনি এই চিন্তাটা কিন্তু অটোমেটিকভাবে আপনার শিশুর ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই শিশুদেরকে সেরা করে গড়ে তুলতে হলে পুষ্টিকর খাবারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। জন্মের পর থেকেই প্রত্যেকটি শিশুর শরীরে দূত পরিবর্তন ঘটে। আর এই সময়ে শিশুকে সঠিক ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। শিশুদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় প্রয়োজনীয় সকল পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ খাবার রাখা উচিত। শিশুদের জন্য সবচেয়ে ভালো ও পুষ্টিকর খাবার হচ্ছে ডিম, দুধ ও কলা। এগুলো শিশুদের শরীরে সুপার ফুড হিসেবে কাজ করে। তাই অন্যান্য খাবারের সাথে এই খাবারগুলো শিশুদের জন্য নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখার চেষ্টা করবেন। ডিমের মধ্যে বিভিন্ন রকমের ভিটামিন, ক্যালসিয়াম এবং প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট আছে। এটি মুরগির ডিম, কোয়েলের ডিম বা হাঁসের ডিম হতে পারে। অনেকেরই হাঁসের ডিমে অ্যালার্জি থাকে। তবে যদি আপনার শিশুর হাঁসের ডিমে কোনো রকম এ্যালার্জি না থাকে, তাহলে সপ্তাহে ৫-৭ দিন খাওয়াতে পারেন। একটা ডিম শিশুকে ৪-৫ ঘন্টা পর্যন্ত তৃপ্ত রাখতে সাহায্য করে। ডিমে থাকা ক্যালসিয়াম শিশুদের হাড় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া ডিমের সাদা অংশে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন আছে।
শিশুদের ভালো ও সুস্থ রাখতে তাদেরকে প্রতিদিন দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। শিশুর জন্মের পর প্রথম এক হাজার দিনকে বিশেষ গুরুত্ব দিন। এ সময় কোনোভাবেই যেন তার দুধের ঘাটতি না হয়। জন্মের পর শিশুকে মায়ের বুকের দুধ দেওয়া সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। দুধ এবং দুধ জাতীয় খাবার, যেমন পনির, চিজ, দই, ঘি, মাখন ছোট বেলা থেকেই শিশুর খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করুন। দুধে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন থাকে। আর আমরা জানি প্রোটিন এবং আমিষ শিশুদের লম্বা হতে সাহায্য করে এবং শরীরের বৃদ্ধি ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশুর আরেকটি অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবার হলো কলা। কলায় বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, মিনারেল, পুষ্টি উপাদান এবং ফাইবার আছে। অর্থাৎ, শিশুর শরীরের সুগঠন ও বিকাশের জন্য কলা অত্যান্ত জরুরি। তাই এই তিনটি খাবার দুধ, ডিম ও কলা নিয়মিত শিশুর খাদ্যতালিকায় রাখার চেষ্টা করুন। দুধ, ডিম এবং কলা এই খাবারগুলো যেন ফিক্সড থাকে শিশুর জন্য। আপনার শিশুকে সুস্থ স্বাভাবিক ও মেধাবী করে বড় করতে চাইলে বাধ্যতামূলকভাবে আপনি পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে। এছাড়া আপনি অন্যান্য পুষ্টিকরকর খাবার ও খাওয়াতে পারেন। শিশুদের জন্য বিভিন্ন ধরনের বাদাম রাখতে পারেন। বাদাম শিশুর ব্রেইন গঠনে সাহায্য করে। তাছাড়া ড্রাই ফুডস যেমন কিশমিশ, খেজুর, আমসত্ত্ব ও এপ্রিকট এই খাবারগুলো মাঝে মাঝে রাখার চেষ্টা করবেন। এটা সপ্তাহে ১ দিন হলেও হবে। এগুলো শিশুর জন্য আসলে সুপার ফুড। এই খাবারগুলো বাচ্চার শরীরে খুব ভালো কাজ করবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে এবং শিশুকে অল্প খাবারে অনেক বেশি ক্যালরি এবং নিউট্রিশন দেবে।
শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও বিকাশে পুুষ্টিকর খাবার
শিশুর পুষ্টিকর
খাবারের গুরুত্ব
শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রত্যেকটা শিশুকে সুস্থ, সুন্দর ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অনেক। শিশুদের ছোটকাল বা শৈশবকাল হলো শরীর ও মস্তিষ্কের দ্রুত বৃদ্ধি ও বিকাশের সময়। তাই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো উচিত। শিশুদের সেরা করে গড়ে তুলতে হলে তাদের পুষ্টিকর খাবারের প্রতি উৎসাহিত করতে হবে। শিশুর শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়ানো অত্যন্ত জরুরি। পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টি শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, মানসিক বিকাশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পুষ্টিকর খাবারে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন এবং খনিজ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকে। ছোটবেলা থেকেই শিশুর খাবারের প্রতি যত্নশীল হয়ে পুষ্টিকর ও সুষম খাবার নিশ্চিত করা প্রত্যেক পিতা ও মাতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ডিম, দুধ, কলা, মাছ, মাংস, ডাল, শাকসবজি, ফলমূল ও বিভিন্ন ধরনের শস্য শিশুর খাবার তালিকায় রাখা উচিত। এসব খাবার শিশুর হাড় ও দাঁত মজবুত করতে, পেশির বৃদ্ধি ঘটাতে এবং শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তি যোগাতে সহায়তা করে। পুষ্টিকর খাবার শিশুর মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও শেখার সক্ষমতা বিকাশে সহায়তা করতে পারে। এছাড়া পুষ্টিকর খাবার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখতে সাহায্য করে। প্রত্যেকটি শিশুর সুস্থ, স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার জন্য এবং সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পুষ্টিকর খাবারের প্রতি মনোযোগী করে গড়ে তোলা উচিত।
দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে পুষ্টিকর খাবার
শিশুর দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে পুষ্টিকর খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে আমরা দেখতে পাই, ছোট বয়স থেকেই অনেক শিশুরা চোখের সমস্যায় ভোগে। শিশুদের এই চোখের সমস্যা দূর করতে তাদের পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর বিকল্প নেই। শিশুদের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত খাবার, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ সাইট্রাস ফল, পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসবজি, বিভিন্ন ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়াতে হবে। শিশুদের দৃষ্টিশক্তি যাতে ভালো থাকে, এজন্য ছোটবেলা থেকেই তাদেরকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর দিকে নজর রাখতে হবে। শিশুদের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে তাদেরকে মাছ, ডিম, শাকসবজি, সাইট্রাস ফল, ড্রাই ফুটস পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়াতে হবে। অর্থাৎ শিশুদের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অসীম।
শিশুর প্রয়োজনীয় প্রধান পুষ্টি উপাদান
শিশুদের সুস্থ বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রধান পুষ্টি উপাদান নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পুষ্টি উপাদান শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, জ্ঞানীয় বিকাশ এবং সামুগ্রিক সুস্থতাকে সমর্থন করে। শিশুদের জন্য কয়েকটি প্রধান পুষ্টি উপাদান অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো প্রোটিন, প্রোটিন শিশুদের প্রয়োজনীয় প্রধান পুষ্টিগুনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রোটিন হলো দেহের গঠনমূলক একক, যা কলাসমূহের বৃদ্ধি, মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অপরিহার্য। এটি শিশুর শরীরের বৃদ্ধি, পেশি ও টিস্যু গঠনে সাহায্য করে। প্রোটিন পাওয়া যায় এমন কিছু খাবার হলো বাদাম, বীজ, মাছ, ডিম, মাংস ইত্যাদি। ক্যালসিয়াম, শিশুদের জন্য ক্যালসিয়াম গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। শিশুদের হাড় মজবুত ও দাঁত গঠনের জন্য ক্যালসিয়াম অপরিহার্য। ক্যালসিয়াম পাওয়া যায় এমন কিছু খাদ্য হলো দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্য, পাতাযুক্ত সবুজ শাকসবজি এবং টোফু। প্রত্যেকটি শিশুকে সকালের নাস্তার সাথে দুধ খেতে উৎসাহিত করুন। এতে শিশুর ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ হবে। ভিটামিন এ, শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, দৃষ্টিশক্তি এবং ত্বকের স্বাস্থ্যের জন্য ভিটামিন এ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন এ পাওয়া যায় মিষ্টি আলু, পালংশাক, গাজর ইত্যাদিতে। ভিটামিন সি, কমলা, লেবু, স্ট্রবেরি, ক্যাপসিকাম, ব্রকলি ও টমেটো এগুলো হলো ভিটামিন সি জাতীয় খাবার। এটি আয়রন শোষণে সাহায্য করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। ভিটামিন ডি: এটি শরীরকে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে, যা হাড়ের বৃদ্ধি ও শক্তি বাড়ায়। ভিটামিন ডি পাওয়া যায়, সূর্যালোক, সামুদ্রিক মাছ, দুগ্ধজাত পণ্য ও ডিমের কুসুমে। আয়রন, রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরির জন্য আয়রন অপরিহার্য। আয়রনের অভাবে শিশুর অ্যানিমিয়া হতে পারে। শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশে আয়রন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জিংক, শিশুর বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ক্ষত সারাতে ভূমিকা রাখে। খাদ্যআঁশ, হজম শক্তি ভালো রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
শিশুর ওজন বাড়াতে পুষ্টিকর খাবার
প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের গুরুত্ব
ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ খাবারের প্রয়োজনীয়তা
শিশুদের জন্য উপকারী ফল ও সবজি
দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের ভূমিকা
ডিম, মাছ ও মাংসের পুষ্টিগুণ
শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পুষ্টিকর খাবার
সুষম খাদ্যভ্যাস গড়ে তোলার উপায়
শিশুদের ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পুষ্টিকর খাবারের কোনো বিকল্প নেই। শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কয়েকটি উপায় দেওয়া হলো নিজেই হোন শিশুর আদর্শ, শিশুরা বড়দের দেখে দেখে শিখে। শিশুরা সবসময় বড়দের অনুসনণ করে। তাই শিশুর মধ্যে সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হলে আগে আপনি নিজে এবং পরিবারের সকল সদস্যরা অভ্যাস মেনে চলুন। পরিবারের সবাই শিশুদেরকে নিয়ে একসাথে বসে নিয়মিত ফলমূল, শাকসবজি, দুধ, ডিম, দই, বাদার খান, তাহলে শিশুও স্বাভাবিকভাবে সেগুলোর প্রতি উৎসাহিত হবে।আকর্ষণীয় প্লেট তৈরি করুন, শিশুরা খাবার খাওয়ার চেয়ে খাবারের প্লেটের দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়। খাবারকে দৃশ্যত আকর্ষণীয় এবং উত্তেজনাপূর্ণ করতে তাদের প্লেটে ফল ও সবজির একটি রংধনু অন্তর্ভুক্ত করুন। পছন্দকে সম্মান করুন, শিশুকে খাবার খাওয়ানোর সময় তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা ও তাদের পছন্দগুলিও স্বীকার করুন। খাবার খাওয়াতে বিভিন্ন উৎসাহ দিন শিশুকে। সারাদিন জল খাওয়ার জন্য উৎসাহ দিন। ধৈর্য ধারণ করুন, নতুন খাবার যোগ করাতে শিশু না ও খেতে পারে। এতে ধৈর্য হারাবেন না। একটি নতুন খাবার গ্রহণ করার জন্য শিশুর বেশ কিছু প্রচেষ্টা লাগতে পারে। তারা প্রাথমিকভাবে প্রত্যাখ্যান করলে চালিয়ে যান। কোনো রকম চাপ ছাড়াই অফার করতে থাকুন। চাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন, শিশুকে জোর করে খাওয়ানো বা চাপ দিয়ে খাওয়ানো মোটেই উচিত নয়, এতে বিপরীতমুখী হতে পারে। খাবারের সময়কে আনন্দময় করুন, শিশুর খাবার খাওয়ার পরিবেশ যেন হয় আনন্দময়। চাপ, শাসন, বকাঝকা বা তর্ক-বিতর্কের মধ্যে খাওয়ালে খাবারের সাথে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে পারে। বরং পরিবারের সবাই মিলে একসাথে খেতে পারেন, গল্প করতে করতে, হাসিখুশি পরিবেশে একসাথে খেলে শিশুরা খাবারকে ইতিবাচক হিসেবে নেবে। খাবারে বৈচিত্র্য রাখুন, একই ধরনের খাবার বারবার না দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খাবার পরিবেশন করুন। সব ধরনের পুষ্টিকর খাবারই যেন শিশুর খাদ্যতালিকায় থাকে। বিভিন্ন রঙের ফল ও সবজি খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া, সময় মেনে খাবার খাওয়া শিশুদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে শিশুরা কখন খেতে হবে তা বুঝতে শেখে।
বয়স অনুযায়ী শিশুর খাদ্য নির্বাচন
শিশুর বয়স অনুযায়ী খাদ্য নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে শিশুর খাবারের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে। জন্ম থেকে শুরু করে প্রতি পর্যায়ে শিশুদের খাবার চাহিদা পরিবর্তন হতে থাকে। তাই বয়স অনুযায়ী শিশুর খাদ্য নির্বাচন করা উচিত। ০-৬ মাস, জন্ম থেকে প্রথম ছয় মাস শিশুর জন্য শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধই যথেষ্ট। যে বাচ্চারা পর্যাপ্ত পরিমাণে মায়ের বুকের দুধ পায়, তারা সব ধরনের পুষ্টিই মায়ের দুধ থেকে পেয়ে যায়। তাদের বাড়তি কোনো খাবারের প্রয়োজন হয় না। আর যে বাচ্চাকে মা বুকের দুধ দিতে পারেন না, তবে সে ক্ষেত্রে ফর্মুলা দুধ দিতে হবে। ৬-১২ মাস, এই সময়টা শিশুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছয় থেকে বারো মাস এ সময়টা বাচ্চাদের বাড়ন্ত সময়। দুই বছর পর্যন্ত বাচ্চাকে মায়ের দুধ দেওয়া যাবে। তবে ছয় মাসের পর থেকে বাচ্চাকে বাড়তি খাবার দিয়ে অভ্যাস্ত করাতে হবে। বুকের দুধের পাশাপাশি নরম ও সহজে হজম হয় এ জাতীয় খাবার দিতে পারেন। যেমন ভাত মিশ্রণ, খিচুড়ি, ডাল, ডিম ,ফলের পিওরি এবং নরম শাকসবজি দেওয়া যেতে পারে। ১২-২৪ মাস, এই সময়ে বাচ্চাকে ৫-৭ বার খেতে দিন। নিয়ম করে খাওয়ান, যাতে শিশু ক্ষুধা বুঝতে শিখে। বিভিন্ন ধরনের রঙীন শাক সবজি ও ফলমূল খেতে দিন। মাছ, মাংস, ডিম, সবজি ও অন্যান্য খাবারগুলোতে শিশুকে ধীরৈ ধীরে অভ্যাস্ত করাতে থাকুন। ছোটবেলা থেকেই শিশুর খাবারের পুষ্টিগুণের দিকে নজর রাখুন। শিশুদের প্রতিদিন ডিম ও কলা খেতে দিন। ২ বছর বা তার বেশি পরিবারের সবাই যা খায় তা সবই অল্প অল্প করে খাওয়াতে পারেন। পরিবারের সুষম খাবারের পাশাপাশি দিনে তিন বার মূল খাবার ও সকাল বিকাল পুষ্টিকর হালকা নাশতা রাখা উচিত। এ সময় অবশ্যই শিশুকে ডিম, দুধ ও কলা খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। কারণ এগুলো প্রচুর পরিমানে প্রোটিন, পুষ্টি ও ভিটামিন রয়েছে। এতে অল্প খাবারে বেশি পুষ্টি পাওয়া যায়। এ সময় থেকে শিশুকে সকল প্রকার গাঢ় হলুদ ও সবুজ শাক-সবজি বেশি দিবেন। মুরগির বা গরুর কলিজা সপ্তাহে ২-৩ দিন খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন। দুধের সাথে বিভিন্ন ধরনের বাদাম মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করাবেন।
অস্বাস্থ্যকর খাবার থেকে দূরে রাখা
জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে পুষ্টির গুরুত্ব অপরিসীম। শিশুদের সুস্থ বিকাশ, শারীরিক ও মানসিক উন্নতি এবং পুষ্টির ঘাটতি রোধ করতে তাদের অস্বাস্থ্যকর খাবার থেকে দূরে রাখতে হবে। তবেই তারা পুষ্টিকর খাবারের প্রতি মনোযোগ দিতে পারবে। অস্বাস্থ্যকর খাবার শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে, শিশুর দাঁতের ক্ষয় এবং বিভিন্ন সমস্যার কারণ হতে পারে এবং পুষ্টিকর খাবারের প্রতি শিশুর আগ্রহ কমে যেতে পারে, শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্লো করে দিতে পারে। তাই শিশুদেরকে অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ানো থেকে দূরে রাখতে হবে। অস্বাস্থ্যকর খাবার শিশুর শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। কারণ এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার শিশুদের স্থূলকায় করে তোলে এবং নানা রোগের কারণ হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) স্থূল জন্মহার, স্থূল মৃত্যুহার ও জনসংখ্যার তথ্য বলছে, দেশে ছয় মাস থেকে দুই বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৪৭ লাখ, কিন্তু রিপোর্টের জরিপের হার বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, ২৩ লাখের বেশি শিশু অস্বাস্থ্যকর খাবার খাচ্ছে, যা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ চিত্র। শিশুদের চকলেট, ফাস্টফুড, চিপস, কোমল পানীয়, আদা প্রস্তুত করা নুডলস, অতিরিক্ত চিনি জাতীয় ও লবণ জাতীয় খাবার থেকে দূরে রাখতে হবে। কোমল পানীয়তে প্রচুর পরিমাণে চিনি ও সংরক্ষক থাকে এবং নানা ধরনের ক্ষতিকর উপাদান থাকে, যা শিশুর অস্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। অতিরিক্ত লবণে ভরা খাবার শিশুর শরীরে ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। অতিরিক্ত লবণ শিশুর উচ্চরক্তচাপের কারণ হতে পারে। শিশু অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে পেট ভরে ফেললে, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করে না। এতে শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য ও ভিটামিনের ঘাটতি হয়। তাই শিশুদের এসব খাবার থেকে দূরে রাখতে পিতামাতাকে সচেতন হতে হবে।



